মাথার ওপর লোহার পাখি, জঞ্জালে ‘মুক্তো’ খোঁজে আরমানরা

107

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: আকাশটায় আজ লোহার পাখির উড়োউড়ি। আজ কলকাত্তার বাবুরা আসবেন। ডিমডিমা চা বাগানে এসে বাগানবাসীকে একবাবু শোনান মমতা দিদি ওদের জন্য কি কি করেছেন। একটু দূরে গয়েরকাটায় আরেকবাবু এসে শোনান মোদীজি কি করে সোনার বাঙ্গাল বানাবেন। ওই বাবু আগে আংরেজিতে বলতেন, ‘আই অ্যাম এ ডিস্কো ড্যান্সার’। আর এখন নাকি  বাংলায় বলে বেড়ান, ‘আমি জাত গোখরো’। মঙ্গলবারও লোহার পাখি নেমেছিল হনুমান মন্দিরের মাঠে। ক্লাস ফাইভের সূরজ ওরাওঁ আকাশে গ্যাটগ্যাট গ্যাটগ্যাট  শব্দ শুনে খেলা ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে দেখেছিল, বিরাট হেলিকপ্টার নেমেছে। ওর মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে গিয়েছিল, ‘বাপরে, কিত্তনা বাড়া হাইক।’ ও শুনেছে, বুধবার আবার আসবে ‘হিলিকপ্টার’। শুনে সূরজ বহুত খুশ!

স্কুল যাওয়ার বালাই নেই গত এক বছর ধরে। আর আজ তো মাঠে মেলা লেগেছে। কিন্তু যত্ত’ নখড়া’ পুলিশ কাকুদের। গতকালও সূরজদের হেলিকপ্টারের কাছে যেতে দেয়নি পুলিশকাকুরা। তবু আশা ছাড়েনি সূরজ। সকাল থেকে বারবার আকাশের দিকে তাকিয়েছে। আরমানও শুনেছে, ‘আজ ফির হিলিকপ্টার আনেওয়ালা হ্যয়।’ কিন্তু ওর সাধ হলেও উপায় নেই। ডিমডিমার সভামঞ্চের এক কিমি দূরে এশিয়ান হাইওয়ের দু’পাশে জমা করা জঞ্জালের স্তূপ থেকে একে একে বের করে আনছিল প্লাস্টিকের বোতল। কোনওটা জলের। কোনওটা কোল্ড ড্রিংকসের। কত্তদিন কোল্ড ড্রিংস খাওয়া হয়নি ওর। ওর বাবা দিনমজুরি করেন। কোনওদিন কাজ জোটে, কোনওদিন বা জোটে না। ওরা থাকে বীরপাড়ার ঝুপড়িপট্টিতে। এক বছর থেকে স্কুলে যাওয়া হয় না আরমানের। যাবেই বা কেন! স্কুলই তো বন্ধ। ওর বাবা তাই বলে দিয়েছেন, ‘বৈঠ বৈঠকে ক্যয়া ক্যারেগা। যা, কুছ কাম ধান্দা কার।’ কাজ খুঁজে নিতে দেরি করেনি আরমান। ওর খেলার সাথীর সাথে বস্তা নিয়ে ছুটে গিয়েছে জঞ্জালের স্তূপ ঘাঁটতে। ডাম্পিং গ্রাউন্ডটা তৈরি না হয়ে ভালোই হয়েছে আরমানদের। স্তূপে অনেক কিছু মেলে। ক্যারিব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতল, মাঝে মাঝে লোহালক্কড়ও। কেজি হিসেবে বিক্রি করে টাকাটা বাবাকে দেয়। ওই টাকা থেকেই আসে ওর হাতখরচও। এশিয়ান হাইওয়েতে তখন একের পর এক গাড়ি ছুটছে জনসভার দিকে। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল আরমান। বস্তাটা ভরে যেতেই উঠে পড়ে আরমান। ওগুলো বেচতে যেতে হবে তো।

- Advertisement -

সুবাহান আবার এ লাইনে সিনিয়র। ও জানে, প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বেচলেই টাকা মেলে। জঞ্জালের স্তূপগুলি ওর কাছে টাকার খনি। সকাল থেকেই স্তূপে স্তূপে ঘোরে সে। চোখ দিয়ে স্ক্যান করে জঞ্জালের স্তূপ। বয়স মেরেকেটে ১৩-১৪ বছর। পড়াশোনার পাট চুকেছে ক্লাস ফাইভের পরই। এরপর কাম ধান্দার পালা। ধান্দায় হাতও পাকিয়েছে। ও জানে কোন স্তূপ থেকে খুব তাড়াতাড়ি বস্তা ভর্তি করার মালপত্র পাওয়া যায়। ‘হেলিকপ্টার দেখে কি টাকা পাওয়া যায়? হেলিকপ্টার দেখে লাভ কি?’ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সুবাহান। তবে সুহানা, পিঙ্কি, অজিতরা আবার গোঁ ধরেছে। ‘হিলিকপ্টার’ দেখবেই দেখবে। যখন বাগানটা বন্ধ ছিল, নদী থেকে বালি বজরি তুলতে বাবা মাকে সাহায্য করত ওরা। বাগানটা খুলে যাওয়ায় ওদের এখন আর কাজ করতে হয় না। এখন মাঠে খেলতে যায় ওরা। বুধবার তখন দুটো বেজে আট মিনিট। মাঠে নামল হেলিকপ্টার। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হেলিকপ্টারের দিকে তাকিয়ে থাকল ওরা। ওদিকে তখন মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছেন অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। বিকেল ৩ টা পেরোতেই উড়ে গেল হেলিকপ্টার। ওরাও ছুটতে লাগল বাড়ির দিকে।