সাত বছর ধরে শাসক ও কমিশনের অকর্মণ্যতার গল্প

387

শুভঙ্কর চক্রবর্তী   

২০১৫ থেকে ২০২১ সময়টা সাত বছর। গত সাত বছরে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু হাঁটতে-চলতে, কথা বলতে শিখে স্কুলে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। সাত বছরে বিধানসভা, পঞ্চায়েত, পুরসভায় শাসক পরিবর্তন হয়েছে। রাজ্য বাজেটের অভিমুখ বদলেছে। ক্লাবে, পুজো কমিটিতে দেদারে টাকা বিলি হয়েছে। চলচ্চিত্র থেকে পিঠেপুলি উৎসব কিছুই বাদ যায়নি। এমনকি চুল্লু খেয়ে মারা গেলেও মিলেছে ক্ষতিপূরণ।

- Advertisement -

সাত বছরে তৃণমূল ভেঙে বিজেপি গড়েছে, আবার বিজেপি ভেঙে তৃণমূল। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা বামেরা শূন্য পেয়েছে। সাত বছরে কলকাতার রাস্তায় বহু কর্মপ্রার্থী পুলিশের লাঠিতে রক্তাক্ত হয়েছেন। চাকরির দাবিতে এক ডজনেরও বেশি অনশন মঞ্চ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনরত মা গর্ভের সন্তান হারিয়েছেন। দেশদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত বিমল গুরুংও ভালো ছেলে হয়ে ঘরে ফিরেছেন। গঙ্গায় জোয়ার এসেছে, তিস্তায় হড়পা বান। সাত বছরে শুধু বদলায়নি রাজ্যের উচ্চপ্রাথমিকের টেট উত্তীর্ণ প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ।

তৃণমূল প্রথম ক্ষমতায় আসার পর উচ্চপ্রাথমিকে নিয়োগের প্রথম বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল ২০১৩ সালে। ২০১৪ সালে অফলাইন ফর্ম ফিলআপ বাতিল করে অনলাইন ফর্ম ফিলআপ হয়। ২০১৫ সালের ১৬ অগাস্ট প্রায় পাঁচ লক্ষ পরীক্ষার্থী টেট-এ বসেন। সাত বছরের হিসেবটা কষা তখন থেকে। আদতে সময়টা নয় বছর।

রাজ্যে তৃতীয় তৃণমূল সরকার এসেছে। তারপরও একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া করতে না পারাকে শুধু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাখ্যা দিয়ে এপিসোড শেষ করা যায় না। খুব স্পষ্ট কথায় এটা শাসকের চূড়ান্ত ব্যর্থতা, শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের অকর্মণ্যতার পরিচয়। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, পরিকল্পিতভাবে মামলা করে নিয়োগ আটকে দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবটা হল, শিক্ষা দপ্তরের বারবার ভুলই মামলার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

প্রশ্ন হল, এই ভুল ইচ্ছাকৃত না গাফিলতি? টেট পরিচালনা, ফল প্রকাশের নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেটা খুবই সহজ। যাঁরা পরীক্ষায় পাশ করবেন, তাঁরা একটা নম্বর পাবেন। সেই নম্বরের সঙ্গে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার নম্বর যোগ করে শতাংশের হিসাবে পদ্ধতিগতভাবে একটি স্কোর তৈরি হবে। সেই স্কোরের ভিত্তিতেই হবে মেধাতালিকা। মেধাতালিকায় উপরে থাকা প্রার্থীরা পর্যায়ক্রমে ইন্টারভিউতে ডাক পাবেন। যতজনকে ডাকা হবে, তাঁরা বাদে বাকিদের নাম থাকবে ওয়েটিং লিস্টে। কোনও কারণে প্রথমে ডাক পাওয়াদের মধ্যে থেকে শূন্যপদ পূরণ না হলে ওয়েটিং লিস্ট থেকে পর্যায়ক্রমে প্রার্থীদের ডাকা হবে।

উচ্চপ্রাথমিকের ফর্ম ফিলআপের সময় প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার নম্বর শতাংশের হিসাবে বসাতে হয়েছে। পরে ইন্টারভিউয়ের জন্য টেট উত্তীর্ণদের আলাদা অনলাইনে ফর্ম ফিলআপ করতে হয়। যেখানে টেটের নম্বর সহ শিক্ষাগত যোগ্যতার নম্বর থাকছে। সেই নম্বরের ভিত্তিতে প্রার্থীর মোট স্কোর (টেট ও অ্যাকাডেমি মিলিয়ে) কত, সেটাও আছে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাজ ছিল, সেই স্কোরকে ক্রমানুসারে সাজিয়ে প্রকাশ। সাত বছরে কমিশন সেটাও সঠিকভাবে করতে পারেনি।

২০১৯-এর ২৩ অগাস্ট উচ্চপ্রাথমিকের টেট উত্তীর্ণ ২৯ হাজার পরীক্ষার্থীর তালিকা বের করে কমিশন। তখন থেকেই দুর্নীতির অভিযোগে একের পর এক মামলা হয় হাইকোর্টে। ২০১৯-এর ৪ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে প্রায় ২৬ হাজার চাকরিপ্রার্থীর মেধাতালিকা বের করে এসএসসি। তাতেও দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়। অভিযোগ এতটাই গুরুতর ছিল, ২০২০-র ডিসেম্বরে হাইকোর্ট সেই তালিকাই বাতিল করে। কীভাবে তালিকা প্রকাশ হবে, সেটা স্পষ্ট করে নয়া তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেয়। কিছুদিন আগে সেই তালিকাও বের করে এসএসসি। তাতেও দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে হাইকোর্টে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কোনওখানেই মিথ্যা সত্য হয় না, শ্রদ্ধাস্পদ বঙ্কিমবাবু বলিলেও হয় না, স্বযং শ্রীকৃষ্ণ বলিলেও হয় না। টেট দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৃণমূল বা রাজ্য সরকারের সাফাই সাধারণ মানুষের কাছে এখন কবিগুরুর কথার মতোই।