জরাজীর্ণ ঘরে পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বন্ধ চা বাগানের কিশোরী

404

বীরপাড়া: বারান্দার চালাটা পাঁচ ফুট উঁচুও নয়। ঢুকতে গেলে কুঁজো হতে হয়! ফুটিফাটা টিনের চালার নীচে বেড়া বলতে কোথাও আটকে দেওয়া ত্রিপল, কোথাও গুঁজে দেওয়া থার্মোকলের টুকরো! কোনও কোনও জায়গায় আবার গায়েব হয়ে গিয়েছে উলুখাগড়ার বেড়া! হুহু করে দমকা হাওয়া ঢুকে নিভিয়ে দেয় সলতে পাকিয়ে জ্বালানো কেরোসিনের কুপি! ঘরে বিদ্যুতের আলো নেই! নুন আনতেই পান্তা ফুরোয়! সে বাড়ির কর্তা আবার বিদ্যুতের বিল মেটানোর টাকা পাবেন কোথায়! তবে হার মানতে রাজি নয় বন্ধ বীরপাড়া চা বাগানের কিশোরী রেশমা রাউতিয়া। ওর চোখে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। পুলিশ হতে চায় রেশমা! আর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ত্রিপলের বেড়া দেওয়া জরাজীর্ণ ঘরেই বইয়ের পাতায় ডুব দিয়ে বুঁদ হয়ে থাকে সে!

আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া চা বাগানের বদিবাড়ি লাইনে বাড়ি রেশমাদের। বাগানটা বন্ধ হওয়ার এক বছর হল তাঁর মা চা বাগানের কর্মী ছিলেন। এখন এক কেজি কাঁচা চা পাতা তুলে দিলে পারিশ্রমিক হিসেবে দশ টাকা পান রেশমার মা সোনামতি রাউতিয়া। ওতেই ভাত, ওতেই কাপড়, ওতেই ওষুধ। রেশমার দিনমজুর বাবা সকাল হতেই ছোটেন কাজের খোঁজে। তবে কোনওদিন কাজ জোটে, কোনওদিন জোটে না। ঘরে আসবাব বলতে দুখানা ছেঁড়া ত্রিপল। ওগুলি বিছিয়েই রাত গুজরান হয় গোটা পরিবারের। তবুও স্বপ্ন দেখে রেশমা। স্বপ্ন দেখে পুলিশ অফিসার হওয়ার। রেশমার বলেন, ‘কাকু আমরা খুব গরিব! খুব কষ্টে থাকি! আমার মা তবুও মাঝে মাঝে হাঁড়িয়া পান করে পড়ে থাকে, বাগানের অনেকেই হাঁড়িয়া পান করে, আমি পুলিশ হয়ে বাগানে হাঁড়িয়া বিক্রি বন্ধ করতে চাই।‘

- Advertisement -

বাগানটা বন্ধ হওয়ার পর থেকে এনজি ও ওজি ডিভিশন নামে বাগানের মূল অংশদু’টিতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কাঁচা পাতা তুলে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ওতে সংসার চলছিল না। তাই অনেকেই পাড়ি দেন ভিনরাজ্যে। কিন্তু লকডাউন শুরু হওয়ার পর ওদের অনেকেই ফিরে আসেন। কিন্তু তাদের অনেকের বরাতেই কাজ জুটছে না। যারা এখনও কাঁচা পাতা তুলে বিক্রি করছেন, তাদের বরাতে জোটেনি পুজোর বোনাস।

এলাকার আঞ্জু নায়েক বলেন, ‘যারা পাতা তুলে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা সবচেয়ে কষ্টে আছেন। তবে রেশমার লড়াইয়ের প্রশংসা করতেই হয়। মেয়েটা এত কষ্টের মধ্যেও মন দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।‘ রেশমা জানায়, বৃষ্টি হলে টিনের চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ে ঘরে ভেসে যায়! চলতি বছরে বর্ষায় বারবার ভিজে গিয়েছে বই, রোদে শুকিয়ে নিয়ে ফের পড়তে বসেছে রেশমা।