অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বিতর্কেও কেন্দ্রীয় অন্তর্ঘাতের ছায়া দেখছে তৃণমূল

798

নিউজ ডেস্ক: বুধবার বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বিতর্কে অংশ নেওয়ার কথা ছিল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই অনুষ্ঠান বাতিল করে ইউনিয়ন৷ অনিবার্য কারণে অনুষ্ঠান স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে ও.ইউ. কর্তৃপক্ষ। এরপরেই নাম না করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে ঘাসফুল শিবির।

এদিন দলের তরফে এক বর্ষীয়ান সাংসদ জানান, বিশ্বের প্রথম সারির বিতর্ক সভা হিসেবে পরিচিত এই অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বক্তব্য রাখার জন্য ডাক পেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। মার্গারেট থ্যাচার ও থেরেসা মে-র পর তৃতীয় মহিলা রাজনীতিক হিসেবে বক্তব্য পেশ করার কথা ছিল মমতার। নিঃসন্দেহে এটি একটি বিরল সম্মান। এর আগে এই বিতর্ক সভায় দুজন ভারতীয়, কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর ও বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বক্তব্য রাখেন৷ মমতা-ই প্রথম ভারতীয় মহিলা রাজনীতিক যিনি অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ডাক পান। কিন্তু এত কিছু প্রস্তুতি সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে কেন অনুষ্ঠান স্থগিত রাখলো ইউনিয়ন তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

- Advertisement -

তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, প্রায় চার মাস আগে এই অনুষ্ঠান চূড়ান্ত হয়। প্রথমে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল বিকেল ৫.৩০ নাগাদ। বুধবার সকালে ও.ইউ. এর তরফে মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করা হয়। অনুরোধ করা হয় অনুষ্ঠানের সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটার বদলে দুপুর ২.৩০ টে নাগাদ করার জন্য। মমতা তাতেও রাজি হন। এরপর অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র আধ ঘন্টা আগেই অক্সফোর্ড ইউনিয়নের তরফে মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে একটি ইমেইল পাঠিয়ে এই অনুষ্ঠান বাতিল করার কথা জানানো হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে এত কিছু প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কেন এই আলোচনা সভা বাতিল করলো অক্সফোর্ড ইউনিয়ন।

দলের শীর্ষ মহলের একাংশের দাবি, এর নেপথ্যে কেন্দ্রীয় অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরাসরি নাম না করে ঘুরিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকেই দায়ি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁদের বক্তব্য, অতীতে এই ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে। ২০১৭-১৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিন ও শিকাগো যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। বেজিং-এ একটি বাণিজ্য সভায় বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন মমতা। একই সাথে শিকাগোয় স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্ব ধর্মসভায় ভাষণের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত রামকৃষ্ণ মিশনের বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রীর। সেই মতন নেওয়া হয়েছিল প্রস্তুতিও। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই একেবারে শেষ মুহূর্তে বাতিল হয় সফর। বিদেশ মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের লাল ফিতের ঘেরাটোপে বাতিল হয় মমতার চিন সফর। অন্যদিকে শিকাগো সফরও শেষ মুহূর্তে বাতিল করে উৎসব কমিটি, কারণ সে সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। শুধু তাই নয় দিল্লির বিখ্যাত সেন্ট স্টিফেনস কলেজে স্মারক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ডাক পেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তাও শেষ বাতিল হয়। স্বাভাবিক ভাবেই অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বিতর্ক বানচাল হওয়ার পিছনেও একই রকমের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা।

বিশেষ সূত্রে তাঁরা জানতে পেরেছেন, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের শীর্ষ আয়োজকদের উপর তুমুল চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে কোনো এক বিশেষ প্রভাবশালী মহল থেকে। শীর্ষ সেই তৃণমূল সাংসদের দাবি, সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। সেই মুহূর্তে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গেলে রাজনৈতিকগত ভাবে তা অনেকেরই অস্বস্তির কারণ হতে পারত। অনেকের পোল খুলে দিতে পারতেন মুখ্যমন্ত্রী অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চ থেকে। তাই প্রভাব খাটিয়ে এই বিতর্ক সভা বানচাল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। সরাসরি নাম না নিলেও তৃণমূল কংগ্রেসের নিশানা যে কেন্দ্রীয় মোদি সরকারের দিকেই, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

তৃণমূল কংগ্রেসের এই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতকে ‘কদর্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন প্রবীন বিজেপি নেতা, শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়। তথাগত বাবু বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে নাম না নিয়ে যে অভিযোগ এখানে আনা হয়েছে তা যে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধেই তা বলাই বাহুল্য। যিনি এই অভিযোগ পরোক্ষে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তুলে ধরেছেন উন্মাদের ন্যায় প্রলাপ বকছেন। এই অভিযোগ হাস্যকর, মনগড়া, অতিরঞ্জিত ও ঘোর আপত্তিকর।‘

তথাগত বাবুর দাবি, ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য ফোরাম। ব্রিটেনে এই ধরণের ফোরামগুলি ভাষা ও মত প্রকাশের অধিকারের উপর যথেষ্ট সক্রিয়। তারা খোদ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেও পিছুপা হন না। তাদের কিনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর মত নেত্রীকে ভাষণ দেওয়া আটকাতে মানা করবে ভারত সরকার। এই ধরণের যুক্তি উন্মাদের প্রলাপের মতো।‘

তথাগত বাবু জানিয়েছেন, মমতা অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ভালো কথা। ইউনিয়ন কেন তাদের অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন তা তারাই বলতে পারবেন। কিন্তু সেই ইস্যুকে হাতিয়ার করে ভিক্টিম প্লে খেলার পাশাপাশি কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে এই নিয়ে অভিযোগ তুললে তা হবে মূর্খামি। পাশাপাশি এসব ‘স্টান্টবাজি’ থেকে নিজেকে বিরত রাখুন মুখ্যমন্ত্রী, পরামর্শ দিয়েছেন তথাগত।