রায়গঞ্জ লাগোয়া গ্রামগুলির এখনও ভরসা খেয়া নৌকা

290

রায়গঞ্জ: স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরেও রায়গঞ্জ শহর লাগোয়া গ্রামগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হল না। অথচ সভ্যতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছেন সর্বত্র। কিন্তু রায়গঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। শহর লাগোয়া গ্রামগুলির এখনও ভরসা খেয়া নৌকা। নদী পারাপারের জন্য খেয়া নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় অধিবাসীদের। তাই অধিবাসীরা নদীর উপর কংক্রিট সেতুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্ত সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।

রায়গঞ্জ শহরের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে কুলিক নদী। নদীর ওপারে রয়েছে রায়গঞ্জ ব্লকের ১০ নং মাড়াইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিক গ্রাম। কয়েক হাজার মানুষ বাস করে গ্রামগুলিতে। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে রায়গঞ্জ শহরে আসতে হয় বাসিন্দাদের। নদীর এপারে রয়েছে রায়গঞ্জ পুরসভার ১৬ নং, ১৭ নং, ২২ নং ও ২৭ নং ওয়ার্ড। নদীর পূর্বদিকে রয়েছে রায়গঞ্জ শহরের ঝা চকচকে আলো ঝলমল যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে খেয়াতরী ঘাটে নদীর উপর কংক্রিট সেতু না থাকায় সারা বছর গ্রামবাসীদের ভরসা খেয়া নৌকা। মাড়াইকুরা গ্রাম পঞ্চায়েতের বহু কাটাবাড়ি, নুসরতপুর কাটাবাড়ি, ভরিয়া, বাসুদেবপুর, ভাতগড়া, ভিটি কাটিহার, এলেঙ্গিয়া, ঘোষপাড়া গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য তথা পড়াশোনার জন্য রায়গঞ্জ শহরের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন তাঁরা ভোরবেলা শাকসবজি, দুধ, দই, মাটির জিনিস নিয়ে রায়গঞ্জ শহরে আসেন। ছাত্রছাত্রীদের স্কুল, কলেজ ও প্রাইভেট টিউশন পড়তে শহরে আসতে হয়।

- Advertisement -

সকাল ছয়টা থেকে রাত্রি আটটা পর্যন্ত খেয়া পারাপার করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌকার মাঝিরা। একসঙ্গে বেশ কয়েকজন যাত্রী না থাকলে নৌকা নিয়ে ওপার থেকে এপারে আসতে চাননা মাঝি। ফলে একদিকে অসুস্থ রোগীরা, অন্যদিকে কোনো জরুরী কাজ নিয়ে কেউ শহরে আসার থাকলে বিপদে পড়েন। অনেক সময় বাধ্য হয়ে তাদের ৩ কিমি ঘুরে শহরে আসতে হয়।

স্থানীয় এক ছাত্র রোহিত দাস এদিন নদীতে স্নান করতে এসে জানায়, এখানে খেয়া-পারাপার বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে দেখে আসছে। বর্ষার সময় কিছুদিন বন্ধ থাকলেও, অন্য সময়ে এই খেয়া-পারাপার চলতে থাকে।

সোলা পাসোয়ান নামে এক মাঝি জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাটে নৌকা পারাপার করি। প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ৫ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। মোটরসাইকেল থাকলে ভাড়া ১০ টাকা দিতে হয়। তবে লকডাউনের পর থেকে নৌকা পারাপারের লোক কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কাটাবাড়ির বাসিন্দা লাল মহম্মদ জানান, সুভাসগঞ্জ সেতু হয়ে যাতায়াত করলে অনেক ঘুরে শহরে আসতে হয়। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায়গঞ্জ শহরে পৌঁছতে তাদের নৌকা পারাপারের উপরেই নির্ভর করতে হয়। এই ঘাটে ছোট সেতু নির্মাণ হলে যাতায়াতে সমস্যা অনেকটাই পূরণ হবে।
রায়গঞ্জ পুরসভার নদী পারের বাসিন্দা অপর্ণা সাহা রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার শ্বশুর বাড়ি ও বাপের বাড়ি দুটো ভিন্ন প্রান্তে হওয়ায় প্রায়ই টাকা দিয়ে নৌকা পারাপার করতে হয়। এখানে সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। আমরা এজন্য আন্দোলনও করেছি, কিন্ত কিছু হয়নি। গ্রামবাসীরা আন্দোলনে নামলে আমরা থাকব।‘

ওপারের ঘোষপাড়ার বাসিন্দা লিটন ঘোষ বলেন, ‘খেয়াতরি ঘাটে সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দেয় অনেকে, তারপর সব চুপ। এবার লিখিত প্রতিশ্রুতি না দিলে আন্দোলনে নামব।‘

১০ নম্বর মাড়াইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কমল দেবশর্মা বলেন, ‘এখানে একটি সেতু হলে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের সমস্যা দূর হবে। তবে গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষে সেতু তৈরি করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের সঙ্গে কথা বলব।‘

রায়গঞ্জ পুরসভার পুরপিতা সন্দীপ বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে ওইখানে ঘাট তৈরি করে দিয়েছি, ঘাটের রাস্তা সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিয়েছি। বাকি দায়িত্ব আমাদের নয়। পুরসভার পক্ষ থেকে যতটা করা সম্ভব, আমরা ততটাই করেছি। সেতুর ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।‘