কংক্রিটের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে লাটাগুড়ির কাঠের বাড়ি

88

শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি : সময়ে সঙ্গে সঙ্গে ডুয়ার্স হারিয়ে ফেলছে তার অনেক ঐতিহ্য। জোছনা রাতে জঙ্গল চিরে দুলকি চালে যাওয়া মিটারগেজ ট্রেন বা হলদিবাড়ি থেকে নৌকায় দিগন্তছোঁয়া তিস্তা পেরিয়ে মেখলিগঞ্জে যাওয়া, সবই একে একে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। একসময় চা, কাঠ, পর্যটন (টি-টিম্বার-টুরিজম)-এর জন্য বিখ্যাত উত্তরবঙ্গ তথা ডুয়ার্সের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল কাঠের বাড়ি। কংক্রিটের বাড়বাড়ন্তে সেগুলিও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

চা বাগানোর কাঠের বাংলো বা গ্রামগঞ্জের কাঠের বাড়ি একসময় ডুয়ার্সের ট্রেডমার্ক ছিল। আর তার অসামান্য নির্দশন দেখা যেত জঙ্গলঘেরা শহরতলি লাটাগুড়িতে। আধুনিকতায় ছোঁয়ায় লাটাগুড়ির সেইসব কাঠের বাড়ি ভাঙা পড়ছে। হাতেগোনা যে কয়েকটি কাঠের বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে লাটাগুড়িতে সেগুলিও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায়। কয়েক দশক আগেও লাটাগুড়িজুড়ে শুধু কাঠের বাড়ি ছিল। লাটাগুড়ির স্টেশনপাড়া, নতুনপাড়া, বাজারপাড়া, পোস্ট অফিসপাড়ায় সার বেঁধে দোতলা কাঠের বাড়ি পর্যটকদেরও চোখ টানত। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সহজলভ্য ও সস্তায় পাওয়ায় লাটাগুড়ির বেশিরভাগ মানুষই তাঁদের মাথাগোঁজার আস্তানা তৈরি করেছিলেন এই কাঠ দিয়ে পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় সাধারণ মানুষ কাঠের বাড়ি তৈরির দিকে ঝুঁকতেন।

- Advertisement -

আটের দশক থেকে বন দপ্তর জঙ্গল থেকে লাগামছাড়া গাছ কাটার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। সহজলভ্য কাঠ হয়ে ওঠে দুর্মূল্য। তারপর থেকেই কাঠের বাড়ির জায়গা নিতে থাকে কংক্রিট। একে তো কাঠের ওপর বন দপ্তরের কড়াকড়ি, তার ওপর ২০০০ সাল থেকে পর্যটন মানচিত্র গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে লাটাগুড়ির। লাটাগুড়ির স্থানীয় কিছু বাসিন্দা নিজেদের উদ্যোগেই লাটাগুড়িতে রিসর্ট তৈরির কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সেখানে বাইরের কিছু ব্যবসায়ীও রিসর্ট তৈরিতে আগ্রহী হন। লাটাগুড়িতে শুরু হয় একের পর এক কংক্রিটের রিসর্ট তৈরির প্রক্রিয়া।

লাটাগুড়ির প্রবীণ ব্যক্তি তথা লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সম্পাদক কমল ভৌমিক বলেন, আটের দশকে লাটাগুড়িতে হাতেগোনা যেমন অনিল গাঙ্গুলি, হাজারি ঘোষদের পাকাবাড়ি ছিল, আজ সেই পাকাবাড়ির সংখ্যা হাজারের ওপর। তার ওপর ছোট-বড় মিলে ৬০টির মতো রিসর্ট রয়েছে লাটাগুড়িতে। তাদের মধ্যে বেশ কিছু দোতলা, এমনকি কয়েকটি চারতলা রিসর্টও তৈরি হয়েছে লাটাগুড়িতে। সেদিকে তুলনা করলে লাটাগুড়িতে আজ কাঠের বাড়ি নেই বললেই চলে। লাটাগুড়ি পোস্ট অফিসপাড়ার হারাধন সরকার, শিবশংকর কর, স্বর্গীয় নরেন চক্রবর্তীর মতো বেশ কয়েকজন বাসিন্দার হাতেগোনা কয়েকটি কাঠের বাড়ি আজও লাটাগুড়ির বুকে রয়ে গিয়েছে। তবে সেগুলিরও সংস্কারের অভাবে বেহাল দশা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কাঠের বাড়ির থেকে কংক্রিটের ঘর অনেক বেশি মজবুত। তাছাড়া  বন দপ্তরের আইনের কড়াকড়িতে কাঠের বাড়ি তৈরির খরচ অনেক বেশি। তাই কাঠের জায়গা দখল করেছে কংক্রিট। তবে ভূমিকম্পপ্রবণ এই এলাকায় কংক্রিটের বহুতল রিসর্ট তৈরি হওয়ায় চিন্তিত অনেকেই।

ময়নাগুড়ি কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রধান মধুসূদন কর্মকার বলেন, জলপাইগুড়ি সহ গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। এখানে বারবার বড় ভূমিকম্প হয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে প্রাচীন মানুষ নিরাপত্তার পথ খুঁজে নিয়েছেন। বাড়ি তৈরিতে ইট, পাথর ব্যবহার করেননি। কাঠ, বাঁশ, খড়ের চল ছিল। পরবর্তীকালে প্রাচীন নির্মাণশৈলী পালটে কংক্রিটের বাড়ি তৈরি শুরু হয়েছে। তবে সঠিক নিয়ম না মেনে কংক্রিটের বাড়ি নির্মাণ করলে বিপদ বাড়বে বলে মত মধুসূদন কর্মকারের। যদিও লাটাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান জগবন্ধু সেন বলেন, লাটাগুড়িতে যে সমস্ত কংক্রিটের নির্মাণ হচ্ছে সেগুলির সমস্ত কাগজ খতিয়ে দেখেই নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।