চা দিবসেও উপেক্ষিত থেকে যান বাগান আগলে রাখা শ্রমিকরা

64
বাগান পাহারা রেডব্যাংকের শ্রমিকদের

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : এখানে এখনও ব্রিটিশ শাসন চলে বলে বিস্তর অভিযোগ। পান থেকে চুন খসলেই পরিচালকদের চোখ রক্তবর্ণ। যে ভিটেতে কয়েক যুগ ধরে বসবাস, তার কোনও আইনি অধিকার নেই। ভাঙা ঘরে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই ছাতা মেলে ধরেন। তবুও বহু বঞ্চনার মাঝে সেই শ্রমিকরাই আজও উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের প্রাণভোমরা।  শুক্রবার গিয়েছে আন্তর্জাতিক চা দিবস। এরকম একটি দিনেও তাঁরা ব্রাত্যই থেকে যান।

২০০২ সাল থেকে কখনও বন্ধ আবার কখনও খোলার সাপসিঁড়ি খেলা দেখতে রেডব্যাংক অভ্যস্ত। ২০১২ সাল থেকে বাগানের ঝাঁপ টানা বন্ধ হয়ে আছে। তবুও নিজেদের আজন্মের সেই ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল কিংবা নির্দেশকের বাংলোর যাতে এক বিন্দুও ক্ষতি না হয় সেজন্য বিনা পারিশ্রমিকেই মহাবীর ওরাওঁ, মানু মুন্ডা কিংবা দুর্গা বড়াইকের মতো ২২ জন শ্রমিক সেখানে পাহারাদারির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। জীর্ণ ফ্যাক্টরির সামনে লাঠি হাতে নজরদারির ফাঁকেই মহাবীর বলে চলেন, পাঁচ পুরুষের বাসভূমি এই বাগান। মালিক ভুলেছে। তাতে কী! আমরা কি ফেলে দিতে পারব? যদি কোনওদিন ফের সাইরেন বাজে। সেই স্বপ্ন কি দেখতে নেই? ১০০ দিনের কাজ,  জিআর-এর রেশন ও সরকারি মাসিক ১,৫০০ টাকার অনুদানে চলা মহাবীরদের স্বপ্ন কবে সত্যি হবে তা কেউ জানেন না।

- Advertisement -

ডুয়ার্সের আরেক প্রত্যন্ত চা বাগান হিলা। একটা সময় এখানকার শ্রমিকরা দীর্ঘ বন্ধ থাকার কষ্ট সয়েছেন। হেঁটে জলপাইগুড়ির জেলা সদরে গিয়ে ভুখা মিছিলের ইতিহাসও হিলার রয়েছে। পরে সরকারি ব্যবস্থাপনার হাত ঘুরে বছর দশেক হল হিলা এখন বেসরকারি মালিকানাধীন। সেখানেই দুর্গা মাহালি ৩৫ বছর ধরে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি ফ্যাক্টরির বৈদার। দিন শেষে হাতে ২০২ টাকা মেলে। ছয়জনের পরিবার। দুর্গাবাবু বলেন, ছুটি বলতে আমাদের কার্যত কিছুই নেই। কাজে গেলে মজুরি মেলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে সংসার চলছে তা একমাত্র আমরাই জানি। মোগলকাটা চা বাগানের গণে ছেত্রী মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে কাঁচা পাতা তোলার কাজে ঢুকেছিলেন। ৩০ বছর পর এখন তিনি ম্যানেজারের গাড়ির চালক। গণে বলেন, সমস্যা অনেক। তবুও এই বাগানই আমাদের কাছে সবকিছু। সুদিনের আশাতেই বেঁচে থাকা।

ইনডং চা বাগানের জঙ্গল লাইনের সোতাইন ওরাওঁ পরপর দুবছর ধরে এখানকার সেরা প্লাকার। কাজে সর্বোচ্চ উপস্থিতির রেকর্ডও তাঁর দখলে। মহিলা প্রধান শিল্প চা বাগানে সোতাইনদের মতো শ্রমিকরা পরিচালকদের কাছে সম্পদ। সোতাইন বলেন, আমাদের বাগানে না হয় পাওনাগন্ডার খুব একটা সমস্যা নেই। তবে বহু বাগানেই যা দেখি তাতে ভয় যে দানা বেঁধে থাকে না তা কিন্তু নয়!

মহাবীর, গণে, দুর্গা বা সোতাইনরা প্রতীকী মাত্র। এখনও পদোন্নতি না হওয়া, বাগানের নিজস্ব রেশন বন্ধ হয়ে যাওয়া, দুটি ছাড়া ডুয়ার্সের আর কোনও বাগানে হাইস্কুল না থাকার মতো বহু সমস্যায় জেরবার শ্রমিকদের কাছে আন্তর্জাতিক চা দিবসের আলাদা করে কোনও তাৎপর্য আগেও ছিল না। এখনও নেই।