উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ব্যর্থতার পিছনে কাজ করেছে অনেক কারণ

144

জয়দীপ সরকার

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তনকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালি ঐতিহ্য ও মননের জয় বলে চিহ্নিত করলে স্বীকার করে নিতে হবে যে, বাঙালির সাম্প্রতিক অতীত অবশ্যই সাম্প্রদায়িকতায় কালিমালিপ্ত। এই বাঙালি ভোটাররাই কিন্তু ২০১৯-এ বিজেপিকে লোকসভার ১৮টি আসনে জিতিয়েছিল। বিধানসভার নিরিখে সেই জয় ১২২টি আসনে। আরামবাগ, ডায়মন্ডহারবারের মতো এলাকায় ২০১৮-এর কলঙ্কিত পঞ্চায়েত স্টাইলে ভোট না হলে হয়তো আরও কিছু আসন বিজেপির ঝুলিতে যেত। তাহলে প্রশ্ন, বাঙালি কি সেদিন আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক ছিল? এবং কোন অভিঘাতে এই পাপস্খলন?

- Advertisement -

প্রশ্ন উঠছে, দক্ষিণবঙ্গে ভালো পারফরমেন্স করলেও উত্তরবঙ্গে তা দেখাতে পারল না কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল? আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, দার্জিলিং জেলায় বিজেপির ভালো ফল কিন্তু অন্য কারণে। এই সাফল্য কোনও সাংগঠনিক দক্ষতার ফসল নয়, পুরোটা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতারও নয়। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের অনন্ত মহারাজপন্থীদের ভোট কোচবিহারে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। জলপাইগুড়ি-আলিপুরদুয়ারে সেই কাজটা করেছে আদিবাসী ভোট। আর পাহাড়ে নেপালিভাষীরা।

আসলে ২০১৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন ছিল সামগ্রিকভাবে ২০১১-র পরবর্তী সময়ে বিরোধী রাজনীতির স্পেসকে একেবারে ধ্বংস করার ক্লাইম্যাক্স। পরিণামে তৃণমূলকে শায়েস্তা করে নিজেদের রাজনৈতিক স্পেস তৈরি করতে তদানীন্তন বিরোধী ভোট, যার পোশাকি নাম বাম ভোট রামে চলে গিয়েছিল। এর পিছনে কিন্তু কোনও সাম্প্রদায়িক সমীকরণ ছিল না,  বিজেপির প্রতি ভালোবাসাও ছিল না। ভালোবেসে নয়, বাঙালির ধারণা ছিল, কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকার সুবাদে বিজেপিই একমাত্র টাইট দিতে পারবে তৃণমূলকে।

গত লোকসভা নির্বাচনের জয়ে বিজেপির সাংগঠনিক কৃতিত্ব খুব কিছু ছিল না। মুকুল রায়ের কৌশলী মাথার ভূমিকা ছিল অবশ্য। সেই মাথা না আছে শুভেন্দু অধিকারীর, না আছে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের। শুভেন্দুর সাহায্য নিয়ে মেদিনীপুরে ৩৫-০ করার আস্ফালন ছিল দিলীপের। সেই মেদিনীপুরের ফল বিজেপির অন্যতম সেটব্যাক। সেটব্যাক অবশ্য প্রায় গোটা রাজ্যেই। অথচ সমসাময়িক সময়ে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসংস্থান ও কাটমানিজনিত বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া তীব্র ছিল।

এই অঙ্কেই বিজেপির ক্ষমতায় আসার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠল  ২০১১-এর পর এই প্রথম দলবদলের এমন ক্লাইম্যাক্স। তাছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কদর্য আক্রমণ, ব্যক্তিগত গালমন্দকে মানুষ বাংলার সংস্কৃতি বলে মানতে পারেনি। অথচ ২০১৯-এ তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতাদের প্রতি তেমন বিদ্বেষ দেখায়নি মানুষ। অর্জুন সিং, নিশীথ প্রামাণিকদের মুখের ভাষা শুভেন্দুর মতো কদর্য ছিল না। তাঁরা মূলত স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ জানাতেন। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতি উচ্চ নেতৃত্বের একপেশে পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। তাঁরা জনগণের সহানুভূতি পেয়েছিলেন, কারণ জনগণের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতি রাগ ছিল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে কিন্তু শুভেন্দুদের ভাষা বহিরাগতের তকমার মতোই ক্ষতি করেছে বিজেপির। মোদির টিজিং সাউন্ড, শমীকের হিসিং সাউন্ড, রাজু-সায়ন্তনদের অশিক্ষিত প্রলাপ সার্বিকভাবে বিজেপিকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক নীতি থেকে শুরু করে এনআরসি, দিল্লিতে কৃষক আন্দোলন ইত্যাদিও মোদি-ফোবিয়ায় ঘাটতি তৈরি করেছে। দুয়ারে সরকারের মতো কর্মসূচি বরং আর কিছু না হোক, তৃণমূলের জনবিচ্ছিন্নতা কাটাতে সক্ষম হয়েছে অনেকটা। বিজেপি দুয়ারে সরকারের পালটা মানুষের মাঝে সেভাবে যেতে পারেনি। বরং বিশ্বজিতের মতো টেট কেলেঙ্কারিতে কুখ্যাত, জিতেন্দ্র তেওয়ারির মতো বিজেপির এমপি পেটানো নেতাদের কাছে টেনে ক্ষমতা দখলের যে শর্টকাট পথ গ্রহণ করেছিল, তা মানুষ মেনে নেয়নি।

তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ মূলত যাদের কারণে, তাদের দলে নিয়ে সরকারে না থেকেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হয়েছে বিজেপিকে। ২০১৯-এ তৃণমূল বিরোধী যে ভোট বিজেপি পেয়েছিল (বাম ভোট রামে বলে যার বদনাম), সেটা এবার বামে না ফিরে তৃণমূলে গিয়েছে। এমনকি, কমিটেড বাম ভোটের একটা বড় অংশও। সাত শতাংশ বাম ভোট চারে নামল শুধু সাধারণ বাম মনোভাবাপন্নদের বিজেপিকে হারানোর দায়বদ্ধতার কারণে। উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ায় ভিক্টরের মতো বিধায়ক এই ভোটে হেরেছেন। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, নিজেও মুসলিম, তা সত্ত্বেও হেরেছেন।

শিলিগুড়িতে অশোক ভট্টাচার্য, রায়গঞ্জে মোহিত সেনগুপ্ত শুধু হারেননি, তৃতীয় হয়েছেন। অধীর চৌধুরীর জেলায় কংগ্রেস শূন্য। আসলে মানুষ বিজেপিকে হারাতে কোনও ফাঁক রাখতে চায়নি। বিজেপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি গিয়ে গদ্দার কেনার সুযোগ না পায়, একেবারে সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপিলে মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে, বিজেপি ১২০ পেলেও সরকার গড়বে। মানুষ প্রতিহত করেছে সেই ঘোড়া কেনাবেচার সম্ভাবনা।

এটা ঘটনা যে, ভাইজানের হাত ধরে বামেদের জাত ও কুল, দুই-ই গিয়েছে। এবারের নির্বাচনে পরিচিতি সত্তার প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার ইঙ্গিত ছিলই। ভাইজানের হাত ধরে বাংলায় মিম যখন ঢোকার মুখে, তখন বাম-গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ জোটে ভাইজানের অন্তর্ভুক্তি বাংলার রাজনীতিতে বড় ঘটনা ঠিকই। কিন্তু শিক্ষিত, প্রগতিবাদী, মধ্যবিত্ত বাঙালি এই জোট মেনে নেয়নি। সিপিএমের মধ্যেও যে বিরোধ ছিল, তা ফল প্রকাশের দিনই তন্ময় ভট্টাচার্যের বিস্ফোরণে স্পষ্ট।

যদিও ভাইজানের হাত ধরে দুএকটা আসন পাওয়ার স্বপ্নে সেই বিরোধ মার্চ-এপ্রিল মাস অবধি চাপা রেখেছিলেন তন্ময়ে মতো দলের আরও অনেকে। অবশ্য কথাগুলো গুরুত্বহীন নয়। আবার ভাইজান কাঙ্ক্ষিত সার্ভিস দিতে পারেননি বলে দুমাস ধরে সামগ্রিকভাবে মুসলিম ও দলিত বাঙালির সামাজিক পশ্চাদপদতা নিয়ে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলোও অপ্রাসঙ্গিক নয়। ভাইজানের কথাগুলোই ইরফান হাবিব বললে আমরা ধন্য ধন্য করতাম। এটা বাঙালি ভদ্রলোক সংস্কৃতির মনন, যে মনন থেকে আমরা এরপরে মমতার চণ্ডীপাঠ, হিন্দি বা ইংরেজি বলা নিয়ে খিল্লি করব। ভাইজানের গ্রহণযোগ্য না হয়ে ওঠার পিছনে ওঁর পুরোনো বক্তব্যগুলো ভীষণরকম কাজ করেছে। একটা ব্রিগেড ওঁকে আমূল বদলে দিয়েছে, সেটা সবাই একবাক্যে বিশ্বাস করবেন, তা তো হয় না। ওঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাই তো তৈরি হয়নি।

ভাইজান কিন্তু প্রথমে তৃণমূলের মুখাপেক্ষী ছিলেন। গোটাদশেক আসন দিলে উনি তৃণমূলের সঙ্গেই থাকতেন। কিন্তু তা হয়নি। কারণ তৃণমূল ভোট ম্যানেজমেন্টের গ্রাউন্ড সার্ভে অনেক নিখুঁত ছিল, মহম্মদ সেলিমদের মতো ভুলভাল নয়, সেটা ভোটের ফল প্রমাণ করেছে।

বিমান বসুদের ১৭ দলের কাগুজে ফ্রন্টের বাইরে অনেক বাম মানুষ আছেন। যেমন দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। তিনি কিছু বললেন আর তাঁকে তৃণমূল বানিয়ে দিল ফেসবুকের বিপ্লবী বামপন্থীরা। বামফ্রন্টের শরিক দলগুলো এখন রক্তাল্পতায় ভুগছে। শুধু ভাগের আসনে লড়ে সাইনবোর্ড বাঁচবে তাদের, বামপন্থা নয়। আজ বিজেপিকে রুখে দেওয়ার উদযাপনে আপ্লুত মানুষকে মনে রাখতে হবে, বিজেপির দখলে কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট। কোনও বিকল্প না এলে এই ৪০ কিন্তু ৫০ হতে সময় নেবে না, কিছু রাজনৈতিক অনুঘটক পাওয়ার অপেক্ষা মাত্র।  ২০২১-এর আগে ২০১৯ ছিল, আবার ২০২১-এর পরে ২০২৪ আছে।

(লেখক কোচবিহারের ইউনিভার্সিটি বিটি অ্যান্ড ইভনিং কলেজের অধ্যাপক)