মালদায় প্রশিক্ষিত ডুবুরি নেই, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ

443

কল্লোল মজুমদার, মালদা: গঙ্গা-মহানন্দা-ফুলহরের গ্রাসে প্রতি বছরই বিঘার পর বিঘা জমি তলিয়ে যায়। ইতিমধ্যেই নদীর তাণ্ডবে মালদার মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে বহু গ্রাম। বর্ষায় জলের তলায় চলে যায় বহু গ্রাম। এবারও পরিস্থিতি প্রায় একই। বন্যায় অনেকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে জেলায়। উথালপাতাল নদী পেরোতে গিয়ে অনেক সময় নৌকা উলটেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে মালদায়। কিন্তু কেউ ডুবে গেলে তাঁকে উদ্ধারের জন্য কোনও প্রশিক্ষিত ডুবুরি নেই জেলায়। ফলে বর্ষা এলেই আতঙ্কে থাকেন নদীপাড়ের মানুষ। বর্তমানে স্থানীয় ডুবুরি দিয়ে কাজ চালাতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ডুবুরিদের প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক পোশাক চেয়ে রাজ্য সরকারের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কাছে প্রস্তাব পাঠাল জেলা প্রশাসন। তবে করোনা পরিস্থিতিতে সেই প্রস্তাব কবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এদিকে, বর্ষার মরশুমে নদীগুলি ভয়কর আকার ধারণ করতে থাকায় উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন জেলা প্রশাসনের কর্তারা সহ নদী পাড়ের মানুষ। জেলার নদীগুলি পারাপারের জন্য রয়েছে বহু ফেরিঘাট। যে ঘাটগুলির কিছু নিয়ন্ত্রণ করে জেলা পরিষদ, কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, মালদা জেলা পরিষদের অধীনে ২০টি এবং পঞ্চায়েতগুলির অধীনে ১০০টিরও বেশি ফেরিঘাট রয়েছে। এছাড়াও ৫০ এরও বেশি ফেরিঘাট রয়েছে, যেগুলির কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই প্রশাসনের। তবে অনুমোদনহীন এই ফেরিঘাটগুলিতে জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নিয়েছে। এই ঘাটগুলিতে প্রতি বছর একাধিক নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। ভরা বর্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতে হয় মানুষজনকে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, পারাপারের সময় লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক।

- Advertisement -

গত দুই বছর থেকে জেলা প্রশাসনের পক্ষে ফেরিঘাটগুলির ইজারাদারদের লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হলেও তা পড়ে থাকে ঘাটেই। তাই নদী পাড়ের মানুষের অভিযোগ, ইজারাদারদের নির্দেশে মাঝিরা নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে নদী পারাপার করেন। আর তাতেই ঘটে যায় বিপদ। সম্প্রতি মালদা শহর সংলগ্ন পুরাতন মালদার সাহাপুর থেকে নদীপথে আসছিলেন বিপুল পরিমাণ মানুষ। যাঁদের অধিকাংশই মহিলা। তবে কারোরই পরনে ছিল না কোনও লাইফ জ্যাকেট। এই প্রসঙ্গে প্রতিক্রিযা জানাতে গিয়ে নৌকাযাত্রী তথা এক মহিলা রমা মণ্ডল বলেন, আমরা প্রতিদিন সাহাপুর থেকে মালদা শহরে বাসাবাড়িতে কাজ করতে যাই। কিন্তু কোনওদিনই আমাদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। আমরা জানিও না প্রশাসনের পক্ষে কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিনা।

কালিয়াচক-৩ নম্বর ব্লকের পারলালপুর ফেরিঘাটেও দেখা যায় একই চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দা মিরাজুল হক বলেন, লাইফ জ্যাকেট পড়ে রয়েছে ইজারাদারদের ঘরে। তবে সরকার থেকে দেওয়া হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। আর একেকটি বড় নৌকায় যাতাযাত করেন একবারে শতাধিক মানুষ। উল্লেখ্য, গত বছর শারদীয়া উৎসবের সময় মালদা জেলার কালিয়াচক-৩ নম্বর ব্লক এবং চাঁচলে পরপর দুটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। যে দুর্ঘটনা দুটিতে প্রাণ হারান কমপক্ষে ১২ জন। এছাড়াও মানিকচকের গঙ্গা, মালদা শহরের মহানন্দা নদীতে প্রতি বছরই বহু মানুষ জলে ডুবে মারা যান। যার কোনও হিসাব নেই প্রশাসনের কাছে। এই পরিস্থিতিতে মালদা জেলায় প্রশিক্ষিত ডুবুরির দাবি উঠেছে।

প্রশাসনিক সূত্রে খবর, এই জেলায় ছয়-সাতজন প্রশিক্ষণহীন ডুবুরি রয়েছেন। নদী ছাড়া পুকুর কিংবা বিলে তাঁদের নামানো হয়। নদীর ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় ভিনজেলার প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের ওপর। ফলে ভিনজেলা থেকে ডুবুরি নিয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করতে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এই সময়কালে নির্ভর করতে হয় ওই এলাকার মৎস্যজীবীদের ওপরেই। তাই এবারের বর্ষার মরশুম শুরু হতেই জেলার ডুবুরিদের জন্য ১০টি নির্দিষ্ট পোশাক ও প্রশিক্ষণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে রাজ্যের কাছে। এপ্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা শাসক অর্ণব চট্টোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জানান, ডুবুরিদের পোশাকের জন্য রাজ্যের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রতি ফেরিঘাটে প্রশাসনের পক্ষে লাইফ জ্যাকেট ও রিং দেওয়া হয়েছে।

মালদা জেলা পরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, মালদা জেলা মূলত নদীমাতৃক এলাকা। এখানে প্রধান নদী গঙ্গা, ফুলহর ও মহানন্দা। এছাড়াও জেলায় ছোট-বড় অনেক নদী রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় ও বন্যায় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। ফলে ডুবুরির প্রয়োজন হয়। কিন্তু মালদা জেলায় কোনও প্রশিক্ষিত ডুবুরি নেই। ডুবুরি নিয়ে আসতে রায়গঞ্জ থেকে। খবর দেওয়ার পর রায়গঞ্জ থেকে মালদায় আসতে হয় অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। তাই এব্যাপারে আমরা বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের মন্ত্রী জাভেদ আকতারের কাছে জেলা প্রশাসনের পক্ষে আবেদন জানাব, যাতে মালদায় ডুবুরির জন্য স্থায়ী ক্যাম্প করা হয়।