বিষবৃক্ষের ফলে হিংসা উত্তরে, চতুর্থ দফার ভোটে চরম সংঘাতের আশঙ্কা

149

গৌতম সরকার : ভোটে উত্তরবঙ্গও হিংসামুক্ত থাকছে না। ট্রেলার দেখিয়ে দিল কোচবিহার। শতাধিক কোম্পানি আধাসেনার ঘেরাটোপ আদৌ নিরাপত্তা দিতে পারল না উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জেলাটিকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কোচবিহার ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোচবিহার সফরের মধ্যে হিংসায় জ্বলে উঠল অতীতের রাজার দেশ, যেখানে প্রজা বিদ্রোহের কোনও ইতিহাস নেই। শান্ত, নির্বিরোধী বলে জেলায় উত্তাপের বার্তা জোগালেন মুখ্যমন্ত্রীও। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আটকে রাখার পরামর্শ দিয়ে বুধবার তিনি কোচবিহার ছেড়েছেন। তার আগে দলকে ভোকাল টনিক দিতে গিয়ে ভোটের পর তৃণমূল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে আসলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল সন্দেহ নেই।

ভয়টা অবশ্য পাচ্ছিলাম মঙ্গলবার দুপুর থেকেই। বাংলায় তৃতীয় দফার ভোট ঘিরে যা হল, তাতে সংবেদনশীল যে কোনও মানুষের বুক কেঁপে ওঠারই কথা। মহিলা হলেও হিংসায় আর ছাড় মিলছে না। তৃণমূলের সুজাতা মণ্ডল খাঁর মাথায় যেভাবে বাঁশ দিয়ে এবং বিজেপির পাপিয়া অধিকারীকে চড় মারতে দেখা গেল, তাতে শিউরে ওঠারই কথা। যে কোনও লোকের তো বটেই, বিশেষ করে মহিলাদের গায়ে হাত তোলা সভ্যসমাজের কলঙ্ক। এই দুই ঘটনার নিন্দায় গর্জে ওঠার পরিবর্তে কোচবিহার আশ্রয় করল এই কলঙ্ককেই। বুধবার এই প্রতিবেদন ছাপতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একের পর এক অশান্তি ঘটছে কোচবিহারে। একজনের মৃত্যু ছাড়াও গুলিতে জখম হয়েছেন তিনজন। এঁদের মধ্যে দুজন তৃণমূলের, একজন বিজেপির। নিহত স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে দলীয় কর্মী বলে দাবি করছেন বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁর পরিবারের অবশ্য দাবি, যুবকটি রাজনীতির সঙ্গে জড়িতই ছিল না।

- Advertisement -

মমতা কোচবিহার ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। অশান্তির আঁচ ছড়িয়েছে পাশের জেলা আলিপুরদুয়ারে। প্রধানমন্ত্রীর সভায় যাওয়ার জন্য জেলা শহরেই আক্রান্ত হলেন একদল বিজেপি কর্মী। পালটা হামলা হয়েছে তৃণমূল কর্মীদের ওপর। অথচ মঙ্গলবার হাওড়া, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় হিংসা দেখেও একটা খটকা ছিল। মনে হয়েছিল, আমাদের এই নির্বিরোধী উত্তরবঙ্গ নিশ্চয়ই এমন ন্যক্কারজনক কাণ্ডে জড়াবে না। কিন্তু রাতটাও কাটতে পারল না। ধারণাটা ভুল প্রমাণিত হল।

উত্তরবঙ্গে একেবারে শেষপ্রান্তের দুই জেলা কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে চতুর্থ দফায় ভোটগ্রহণ আগামী শনিবার। সেদিনই প্রথম উত্তরবঙ্গে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। মঙ্গলবার রাত থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলিতে স্পষ্ট, উত্তরবঙ্গেও গণতন্ত্র হাঁড়িকাঠে চড়তে বসেছে। হিংসার এই বীজ কোচবিহারেই চাষ হয়েছে বেশি। প্রকৃতি যতই শান্ত, মনোরম হোক, দলীয় স্বার্থ বারবার হানাহানিতে মদত দিয়েছে কোচবিহারবাসীকে। বামফ্রন্ট জমানায় বিরোধী শক্তির কোনও জোর ছিল না ঠিকই। কিন্তু অশান্তি কম ছিল না। দুই বাম শরিক সিপিএম ও ফরওয়ার্ড ব্লক নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে শক্তিক্ষয় কম করেনি। চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকে এই হানাহানিতে প্রায় রোজ গুলি, বোমা, তির চলেছে কোচবিহার শহরের অনতিদূরে চান্দামারি, মাঘপালা, চিলকিরহাট ইত্যাদি গ্রামে।

তৃণমূল জমানায় সেই হিংসাকে দলীয় কর্মসূচির অঙ্গ করে তুলেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে অনুগামীরা। ২০১১-তে রাজ্যের ক্ষমতায় আসার আগে ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে তুফানগঞ্জ মহকুমার ২টি পঞ্চায়েত সমিতি দখল করেছিল তৃণমূল। ভোটের ফলাফলের কয়েকদিনের মধ্যে তৃণমূলের হামলায় তুফানগঞ্জ লাগোয়া এলাকায় সিপিএমের ১৪টি দলীয় কার্যালয় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই তাণ্ডবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিপিএম থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া কর্মী-সমর্থকরা। তারপর থেকে হিংসায় আর বিরাম ছিল না। ২০১১ সালে রাজ্য দখলের পর তা আরও ব্যাপ্ত হয়। বিরোধীশূন্য বাংলা গড়ার উন্মত্ততায় কোচবিহার অন্যতম মডেল হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে নয়, জোর করে বিরোধীদের দাবিয়ে রাখাই হয়ে উঠেছিল তৃণমূলের একমাত্র অস্ত্র।

কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রোপণ করা সেই বিষবৃক্ষে ফল ধরে অচিরেই। নেতাদের প্রশ্রয়ে গ্রামস্তরে ক্ষমতা দখলের মোহ নয়, বেপরোয়া লোভে স্থানীয় কর্মীরা অস্ত্র মজুত করে, কথায় কথায় মারদাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, খুনোখুনি চরমে তোলে। সেই কর্মী-সমর্থকদের একাংশই ঠাঁই নিয়েছে বিজেপিতে। দলত্যাগ করলেও হিংসার সেই সংস্কৃতি ত্যাগ করতে পারেনি তারা। বরং ফেলে আসা দলকে শিক্ষা দিতে তাদেরও প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে হিংসা। ক্ষমতা দখলে মরিয়া বিজেপিও নিজের স্বার্থে সেই সংস্কৃতিকে লালনপালন করে চলেছে। কোচবিহারে হিংসাই এখন দুই প্রধান প্রতিপক্ষের রাজনীতি। যদিও এমন নয় যে, কোচবিহারের বাইরে এর আঁচ নেই। আলিপুরদুয়ার মঙ্গলবার রাতে ট্রেলার দেখিয়েছে। জলপাইগুড়িতে ছোটখাটো বিক্ষিপ্ত অশান্তি হচ্ছে মাঝেমধ্যে। ফলে উত্তরবঙ্গে শান্তিতে ভোট সম্ভবত দূর স্বপ্ন হতে চলেছে।