বালি মাফিয়া আর নেতাদের দুষ্টচক্র ভাঙার লোক নেই

358

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

উত্তরের বিভিন্ন জেলায় একশ্রেণির মানুষ হঠাৎ বড়লোক হয়ে উঠেছেন। অথচ তাঁরা না করেন কোনও চাকরি, না ব্যবসা। তবে তাঁদের হাতে রয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা। সেই টাকার জেরেই তাঁরা যেমন স্থানীয় রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন তেমনি পুলিশ, প্রশাসনের সঙ্গেও তাঁদের সখ্য তৈরি হয়েছে। আর এই টাকার দুটি প্রধান উৎস বেআইনি জমি এবং বালি খাদানের কারবার।

- Advertisement -

আসলে বিনা পুঁজির কারবার বলতে যা বোঝায় ওই দুই কারবার ঠিক তাই। জমির কারবারে আইনি ঝক্কি অনেক বেশি থাকলেও বালি খাদানে তা নেই। তাই সহজে বড়লোক হতে বালি, বোল্ডারের কারবারে নাম লেখানোর হিড়িক পড়ে গিয়েছে। এখানে বিনিয়োগ শূন্য, অথচ আয় কোটি কোটি টাকা। শুধু মাসল পাওয়ার ও মাথায় কোনও নেতার হাত থাকলেই রমরমিয়ে চলবে কারবার।

নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুক খুবলে নেওয়ার ছবি তুলতে তুলতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে ক্যামেরা। তবুও থামানো যায়নি জেসিবি মেশিন। যায়নি বলা ভুল, বলা ভালো থামানো হয়নি। কারণ মেশিন যত বড় গর্ত করবে বাতাসে তত বেশি টাকা উড়বে। আর তাই নদীকে আশ্রয় করে বাঁচা উত্তরবঙ্গের মানুষের সঙ্গে নদীর দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

নদী যত দূরে যাচ্ছে ততই কাছে আসছে মাফিয়ারা। বালি-পাথর, বোল্ডার, মাটির সঙ্গে খানিকটা অপরাধবোধও লরিতে করে পৌঁছে যাচ্ছে গৃহস্থের বাড়িতে। নানা কায়দায় চুরি হয়ে যাচ্ছে লিস, ঘিস, সংকোশ, রায়ডাকের সম্পদ।

নদীগর্ভ যাতে উঁচু হয়ে না যায় তার জন্য সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে নদী থেকে বালি-পাথর তোলা হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পদ্ধতি মেনে নদীর নির্দিষ্ট এলাকাগুলি ইজারা দেওয়া হয়। তবে সেই ব্যবস্থাপনার বাইরে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার জুড়ে বেআইনিভাবে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তোলা হচ্ছে বালি-পাথর।

আর কিছু মানুষের এই অতিরিক্ত লোভ ডেকে এনেছে মহাবিপদ। বাড়ছে ভাঙন, বারবার পরিবর্তন হচ্ছে নদীর গতিপথ, বন্যা, শস্যহানির মতো ঘটনা ঘটছে। প্রতি বর্ষাতেই তলিয়ে যাচ্ছে একরের পর একর জঙ্গল, চা বাগানের জমি। গৃহহীন হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। বিপর্যয়ে মুখে পড়ছে বন্যপ্রাণীরা।

একটা বড় মাফিয়া চক্র তৈরি হয়েছে। সেই চক্রে আলিপুরদুয়ারের লোক যেমন আছে তেমনি শিলিগুড়ির কারবারিরাও যুক্ত হয়েছে। আছে পুলিশ, প্রশাসনের একাংশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা, ক্লাব, সংবাদমাধ্যমের একাংশ আর কিছু গুন্ডা। আসলে এরা একে অপরের পরিপূরক। যে যার স্বার্থে নদী খাদানের বেআইনি কাজকে পূর্ণ সহয়োগিতা করে যাচ্ছে।

আলিপুরদুয়ারের সংকোশ নদীর কথাই ধরা যাক। বলা হয় ডুয়ার্সে সংকোশের বালি গুণগতমানে অন্য নদীর থেকে ভালো। তাই সেই বালির চাহিদা বেশি। যেখানে চাহিদা বেশি সেখানে টাকাও বেশি। পশ্চিমবঙ্গে সংকোশের বুকে কমপক্ষে ১৫টি বেআইনি বালি খাদান তৈরি হয়েছে । যেগুলি থেকে প্রতিদিন শতাধিক লরি বালি চুরি হচ্ছে।

তরাই এলাকায় বালাসনের বালি-পাথরের চাহিদাও অনেক বেশি। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, কোচবিহারের চ্যাংরাবান্ধায় তো ভরা নদীর মাঝখানে অত্যাধুনিক মেশিন বসিয়ে বালি তোলা হয়। বাগডোগরা লাগোয়া ব্যাংডুবি এবং লোহাগড় এলাকায় পাহাড়ি নদীর মাঝ বরাবর তৈরি করা হয়েছে মাটির রাস্তা। জঙ্গল, চা বাগান ঘেরা সেই রাস্তা ধরে নদীতে ঢুকে যায় বড় বড় লরি। তারপর বোল্ডার চুরি করে ফিরে যায় গন্তব্যে।

রাজ্য বা জাতীয় সড়কের কাজের সময় হাজার হাজার লরি পাথর, বোল্ডার বা মাটি ব্যাবহার হয়। সত্যিটা হল, এর একটা বড় অংশই আসে বেআইনিভাবে। একটা ছোট্ট হিসেব দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। বর্তমানে এক ট্রলি মাটি বিক্রি হয় কমপক্ষে ১ হাজার টাকায়। এক লরি পাথরের দাম ন্যূনতম ৬ হাজার টাকা। বালির গড় দাম ৪ হাজার টাকা। যে ঠিকাদার বা ঠিকাদারি সংস্থা রাস্তার কাজ করবে তাদের সেই বালি-পাথর, মাটি কিনতে হবে উপযুক্ত পদ্ধতি মেনে সরকারকে কর দিয়ে।

ধরা যাক কোনও কাজের জন্য ১০০ ট্রলি মাটি এবং ১০০ লরি করে পাথর ও বালি লাগবে। সেই হিসাবে মাটির জন্য ১ লক্ষ এবং বালি-পাথরের জন্য ১০ লক্ষ টাকা খরচ করতে হবে ঠিকাদারকে। অথচ বেআইনিভাবে সেগুলি তুললে শুধুমাত্র লরি ভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি দিলেই হয়ে যাবে। আর কাগজেকলমে দেখানোর জন্য বৈধ পদ্ধতিতে কিছু বালি, মাটি কিনলেই হয়ে গেল। বাকি থাকল তদারকিতে আসা সরকারি আধিকারিক। তাঁকে যে খুব সহজেই খুশি করা যায় সেটা এখন কারও অজানা নয়।

শুধু সড়ক নির্মাণ নয়, বেশিরভাগ সরকারি কাজেও ঠিকাদাররা একই ফর্মুলা মেনে চলেন। মাটি, বালি-পাথর তোলার জন্য পদ্ধতি মেনে যে সরকারি রয়্যালটি দেওয়া হয় তাতে নির্দিষ্ট সময়, পরিমাণের উল্লেখ থাকে। সেই সময়ে পর রয়্যালটি ভিত্তিতে বালি-পাথর তোলা যায় না। বাস্তবে একই রয়্যালটি বারবার দেখিয়ে তোলা হয় বালি-পাথর। তার ফলে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে রাজ্য সরকারের। অথচ সব জেনেও পদক্ষেপ করছে না প্রশাসন।

বহু বছর আগে আলিপুরদুয়ার মহকুমার এক ভূমি সংস্কার আধিকারিক রাজ্যে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন। বালি-পাথর চুরি ঠেকাতে তিনি অভিনব পন্থা নিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যিনি বালি-পাথর বা মাটি কিনবেন প্রকৃতপক্ষে রয়্যালটি তাঁর নামেই কাটতে হয়। অর্থাত্ দোকান থেকে কোনও জিনিস কিনলে যেমন ক্যাশমেমো দেওয়া হয় তেমনি কোনও ব্যক্তি যার কাছ থেকেই বালি-পাথর কিনুন না কেন রয়্যালটি হল তাঁর সেই ক্যাশমেমো। এককথায় বৈধ উপায়ে সরকারকে উপযুক্ত কর দিয়ে বালি কেনার প্রমাণপত্র।

কিন্তু গৃহস্থকে না দিয়ে সেই কাগজ লরিচালকরা নিজেদের কাছে রেখে দেন এবং সেই কাগজের অপব্যবহার করেন। ওই আধিকারিক শহরে যেখানেই নির্মাণকাজ হত সেখানে গিয়ে হাজির হতেন। মালিকের কাছে দেখতে চাইতেন রয়্যালটি। কার্যত কেউই সেই কাগজ দেখাতে পারতেন না। কারণ কেউ জানতেনই না যে রয়্যালটি তাঁদের নামে কাটা হয় এবং সেটা কখনও প্রয়োজন হতে পারে।

রয়্যালটি দেখাতে না পারায় বেশ কয়েকজনকে জরিমানাও করেছিলেন তিনি। তাঁর সাফকথা ছিল, রয়্যালটি নেই মানে বেআইনিভাবে তোলা হয়েছে। ওই পদক্ষেপে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে মাফিয়ারা। যদিও অজানা কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় অভিযান। ওই পদ্ধতি মেনে নির্মাণ ক্ষেত্রগুলিতে লাগাতার অভিযান চালানো হলে সাধারণ মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি চুরি অনেকটাই ঠেকানো যেতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। আর সেটা হলে সরকারের আয়ও বাড়বে।

বেকারত্ব উত্তরবঙ্গের অন্যতম জ্বলন্ত সমস্যা। সেখানে নদী থেকে বালি-পাথর তোলার কাজ করে সংসার চলে লক্ষাধিক মানুষের। খিদের যন্ত্রণার চাইতে বড় যন্ত্রণা নেই। সেই যন্ত্রণাই বালি মাফিয়াদের অন্যতম হাতিয়ার। অবৈধ বালি খাদানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হলেই ঢাল হিসাবে ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের সামনে এগিয়ে দেন মাফিয়ারা। তাই শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত না হলে বাস্তবে অবৈধ বালি খাদানের কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা কোনও সরকারেরই পক্ষেই সম্ভব নয়।

তবে সৎ, স্বচ্ছ আধিকারিকরা এগিয়ে এলে, ঘুষের লেনদেন বন্ধ হলে মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব। নদীর যে অংশ সরকারি ব্যাবস্থপনায় বালি-পাথর, বোল্ডার তোলার জন্য ইজারা দেওয়া হয় সেখানে পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের কাজের সুয়োগও দেওয়া যেতে পারে। তাই যাতে সাপও মরে আর লাঠিও না ভাঙে সেই ধরনের উপায় খুঁজে বের করতে হবে সরকারকেই।