যাঁকে-তাঁকে ভাইরাল করার আগে একটু ভাবুন

সামাজিকমাধ্যম নামক এক অসম্ভব শক্তিশালী মতপ্রকাশের অলিন্দ আজ নেটিজেনদের হাতের মুঠোয়তার কল্যাণে আমরা আজকাল হ্যাশট্যাগ বিপ্লব করি, দেওয়ালে দেওয়ালে মনের খেয়ালে প্রতিবাদের ভাষা ব্যক্ত করিঅথচ পালের হাওয়ার বাইরে নিজেদের অবস্থান খোঁজার মতো মেরুদণ্ড আমাদের আজও তৈরি হল নালিখেছেন রূপায়ণ মুখার্জি

মৃদুলকান্তি চা খেতে চেয়েছিলেন, মৃদুলকান্তি চা খেতে পারেননি।

- Advertisement -

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর প্যারোডি আমার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য নয় মৃদুলকান্তি দেবকে নিয়ে নতুন কোনও প্রহসন লেখা। সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে তাঁর ভার্চুয়াল লিঞ্চিং বহু আগেই হয়ে গিয়েছে। ইউটিউব খুললে এখনও ভেসে ওঠে হাল আমলের র‌্যাপারের গানের তালে নৃত্যরত তাঁর নির্মিত অবয়ব। ব্যাকগ্রাউন্ডে বারবার ধ্বনিত হয়, আমরা চা খাব না, খাব না আমরা চা? তবু যাঁরা আমার মতো অন-আধুনিক ও সামাজিকমাধ্যম বিষয়ে কিছুটা অজ্ঞ, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, চলতি বছরের গত ২২ মার্চ অর্থাৎ কি না জনতা কার্ফিউয়ে সূচনার দিনে মৃদুলবাবু রাস্তার দোকানে চা খেয়েছিলেন। গর্হিত কাজ, সন্দেহ নেই। তাই নিমেষে তাঁকে ভাইরাল করা হয়। তাঁর প্রশ্ন আমরা চা খাব না, খাব না আমরা চা হয়ে ওঠে শো যা বেটে, নেহি তো গব্বর সিং আ যায়েগার মতো জনপ্রিয় সংলাপ। একাধারে জনপ্রিয় বেতার ও টিভি শিল্পী তাঁর স্বরচিত বাণিজ্যিক লিরিকের ফাঁকে চা খাব না গুঁজে দিয়েছেন। পাবলিক খাবে ভালো। আমরা চা খাব না, খাব না আমরা চা লেখা কিছু টি-শার্ট বোধহয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। পরগাছা চরিত্রধর্মী পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় ফ্যাশন ডিজাইনাররাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন?

হাসি খুব নির্মল, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই আপাতদৃষ্ট নির্মলতার ঊর্ধ্বে আছে এক রাজনীতি, যা প্রায়ই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। এই রাজনৈতিকতা হাসির শক্তিও বটে, তাই গঠনমূলক সমাজতন্ত্রে হাসির অপরিসীম গুরুত্ব আছে। হাসি সংশোধনধর্মী। এই সংশোধনধর্মীয়তা হেনরি বার্গসন-এর মতে কারেক্টিভ এলিমেন্ট ইন লাফটার। অর্থাৎ হাসির সাহায্যে ক্ষমতাশালী বা বিত্তবানের সমালোচনা করা যায়, অস্বাভাবিককে সংশোধন করে দেখানো যায় স্বাভাবিকতার রূপ। প্রহসন সাহিত্যের যা মূল উদ্দেশ্য আর কী। হুতোম প্যাঁচার নকশা, কমলকান্তের দপ্তর কিংবা সুকুমার রায়ে অসামান্য কাব্যকীর্তি ইত্যাদি সংশোধনধর্মী উপহাস সাহিত্যের সবল দৃষ্টান্ত। তবে এই সংশোধন বা স্বাভাবিক-এর মতো শব্দবন্ধ বড় গোলমেলেও বটে। এইসব শব্দের বিশ্লেষণে ফিরে ফিরে আসে এক অতি সূক্ষ্মরেখা, যা আমরা ও ওরা নামে দুটি বিভাজিত গোষ্ঠী তৈরি করে। আমরা যারা হাসছি, আমরা স্বাভাবিকতার প্রতিনিধি। যাদের তাচ্ছিল্য করে হাসছি, ওরা অস্বাভাবিক। আমরা সুস্থ, ওরা অসুস্থ। সর্বোপরি আমরা উন্নত সমষ্টি, ওরা অনুন্নত। তাই ওরা হাস্যাস্পদ এবং ওদের সংশোধন দরকার। থমাস হবস হাসির এই বিভাজনধর্মীয়তাকে সুপিরিওরিটি থিওরি অফ লাফটার বলে উল্লেখ করেছেন। একটু তলিয়ে ভাবলে দেখা যাবে, হাসির যে স্টিরিওটাইপগুলো আমাদের সমাজে প্রচলিত, তার সিংহভাগজুড়ে রয়েছে প্রান্তিকতা। নারীসুলভ পুরুষ, গেঁয়ো চাষি কিংবা স্থূলাকৃতি রমণী এই প্রান্তিকতার কতিপয় উদাহরণ মাত্র। মূলধারার চলচ্চিত্র বা স্কিটে যেসব হাস্যকৌতুক শিল্পী অভিনয় করেন, সেসবের অধিকাংশই এই স্টিরিওটাইপ নির্ভরশীল।

ক্ষমতা ও কেন্দ্র-প্রান্তের এই অঙ্ককে তাই স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক বিভাজনের থেকে আলাদা করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাহা সামাজিক মূলধারায়, তাহাই ক্ষমতার কেন্দ্রে এবং তাহাই স্বাভাবিক। তাই বিধবা বিবাহের প্রবর্তক ও বাল্যবিবাহ প্রথাবিরোধী বিদ্যাসাগরকে ব্যঙ্গ করে হাসির গান বাঁধা হয়, স্বদেশি আন্দোলনের সমালোচনা করায় রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন গণ উপহাসের পাত্র। সময় বদলেছে, আধুনিকতার আলো পৌঁছে গিয়েছে প্রায় সর্বস্তরে। সামাজিকমাধ্যম নামক এক অসম্ভব শক্তিশালী মতপ্রকাশের অলিন্দ আজ নেটিজেনদের হাতের মুঠোয়। তার কল্যাণে আমরা আজকাল হ্যাশট্যাগ বিপ্লব করি, দেওয়ালে দেওয়ালে মনের খেয়ালে প্রতিবাদের ভাষা ব্যক্ত করি। অথচ কী পরিহাস! পালের হাওয়ার বাইরে নিজেদের অবস্থান খোঁজার মতো মেরুদণ্ড আমাদের আজও তৈরি হল না। মৃদুলবাবু চা খেলেন, আমরা অমনি ঝাঁপিয়ে পড়লাম তাঁর ওপর। তাঁকে ভাইরাল করে দেখিয়ে দিলাম সামাজিকমাধ্যমের জোর, হুঁ হুঁ বাওয়া, আমরা নেটিজেন। আমাদের গভীর দূরদৃষ্টি আছে। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকের জন্য ঘোর বিপদ আসন্ন। একদিন নিয়ম করে ঘরে থাকলে আমরা করোনামুক্ত ভারতবর্ষ তৈরি করতে পারব, আর এরা করতে পারে না? চা খেতে বেরিয়েছে। দেশে লোক মরছে, আর এসব কাকু চা খাচ্ছে। কীরকম বেয়াক্কেলে সব! অশিক্ষিতের দল! এদেশের অশিক্ষিত সমাজসংস্কার আমাদেরই করতে হবে, আমাদের হাতে মোক্ষম অস্ত্র মুঠোফোন ও মুঠোফোনের দাওয়ায় সদাসক্রিয় সামাজিকমাধ্যম। অতএব সোজা ভাইরাল। মৃদুলবাবু সেদিন আর পাঁচটা দিনের মতো কাজে গিয়েছিলেন। জানতেন না জনতা কার্ফিউটা আসলে ঠিক কী। কিন্তু আমাদের তা জেনে কাজ নেই। আমরা এটুকু জানি যে, লকডাউন অমান্য করা গর্হিত অপরাধ, চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। অতএব সংশোধন প্রয়োজন। পেশায় দিনমজুর মৃদুলবাবুর পক্ষে ওয়ার্ক ফ্রম হোম সম্ভব কি না, তা বোঝার কোন দায় আমাদের?

মৃদুলবাবু জানতেন না, কেন চা খাওয়া যাবে না। খানিকটা অবুঝের মতো বলে ফেলেছিলেন, আমরা চা খাব না, খাব না আমরা চা? আমাদের তো অত তলিয়ে বোঝার দায় নেই। তাঁর ওই সাদামাঠা প্রশ্নের মধ্যে আমরা দেখেছি চরম অবাধ্যতা। বলে কী লোকটা? দেশে লোক মরছে আর আমরা এখানে চা খাব? লোকটার কোনও দূরদৃষ্টি নেই? নিজের চা খাওয়ার অভ্যাস বা ইচ্ছে ছাপিয়ে একটা বৃহত্তর প্রেক্ষিত দেখতে পারছে না? এজন্য এই দেশের কিছু হবে না! কিন্তু আমাদের দূরদৃষ্টি গভীর, তাই আমরা তাঁকে নিমেষে ভাইরাল করলাম। আমাদের দূরদৃষ্টি এতটাই গভীর যে, আমরা ভেবেছিলাম, একদিন কড়া জনতা কার্ফিউ করলে করোনা ঠান্ডা হয়ে যাবে এবং আমরা পরের দিন থেকে বাসে-ট্রামে চেপে নগরকীর্তন করব। আমাদের অন্তর্দৃষ্টি এতটাই সূক্ষ্ম যে, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের বাইরেও যে অনেক কাজ থাকতে পারে, তা আমাদের একেবারে জানা ছিল না। আমরা এতটাই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন যে দেশের অধিকাংশ শ্রমজীবী যে এখনও অসংগঠিত এবং রোজের রোজগারের ওপর নির্ভরশীল, তা আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। পরিযায়ী শ্রমিক কে বা কারা, পরিকল্পনাবিহীন সুদীর্ঘ লকডাউনে তাঁদের কী অবস্থা, এসব আমাদের ভাবার কোনও প্রেক্ষিত তখনও তৈরি হয়নি। তাই আমরা ভাবব না! আমরা দূরদৃষ্টি, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, চিন্তক মধ্যবিত্ত নেটিজেন! ব্রুটাসের মতো আমরা কখনও ভুল করতে পারি না। কারণ আমরা বিত্তশালী উচ্চ ও মধ্যবিত্ত নেটিজেন। আমরা কি শুধু হাসাহাসি করি নাকি? এই তো সেদিন, দিল্লির রাস্তায় রামপুকার পণ্ডিত কান্নায় ভেঙে পড়লেন, আমরা কি তাঁর ছবি শেয়ার করিনি?

কিন্তু আগে ওই কষ্টটা পেতে হবে তো! তবে তো আমরা বুঝব যে, আমাদের স্বস্তি আর সমৃদ্ধির পৃথিবীর বাইরে আর একটা পৃথিবী আছে! আমরা তো জেনে বসে আছি যে, আমাদের দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি অসম্ভবভাবে ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর অনুকূল। আমাদের সবার সচ্ছল কর্মসংস্থান আছে, প্রযুক্তি আছে, হালফ্যাশনের মুঠোফোনে তামাম ঢপের চপ আছে। তাহলে আর ভাবনা কী? ঘরে বসেই তো কাজ করা যায়! বাইরে না বেরোলেই নয়? সত্যি তো, সীমান্তে সৈনিকরা দেশের জন্য জান কবুল করতে প্রস্তুত আর আমরা একটু ঘরে থাকতে পারব না? হে সহৃদয় পাঠক! অধমকে ভুল বুঝবেন না। বুঝলেও খুব একটা ক্ষতি নেই। কারণ মহাভারতের অর্জুনের মতো আমার আজ বলতে ইচ্ছে করছে, ন তু কেনচিদত্যন্তং কস্যচিদ্ হৃদয়ং ক্কচিৎ। কেউ কোনওদিন কারও মন বুঝতে পারে না! তবে করোনা পরিস্থিতিতে বেলাগাম বহির্গামিতাকে প্রশ্রয় দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। মহামারি মোকাবিলায় সচেতনতা অসম্ভব প্রয়োজনীয়। সর্বোপরি ১৮৯৭-এর এপিডেমিক ডিসিজেস অ্যাক্ট অনুযায়ী মহামারি প্রতিরোধে জারি সরকারি নির্দেশিকা অমান্য করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই মৃদুলবাবুকে সতর্ক ও সচেতন করা প্রয়োজন ছিল। তবে সেই সচেতনতার পাঠ পড়াতে গিয়ে যদি শিক্ষার্থীর কপালে জোটে চরমতম অসম্মান ও লাঞ্ছনা, তখন সেই পাঠের নৈতিক গঠন সম্বন্ধে প্রশ্ন ওঠা বোধহয় অযৌক্তিক নয়। সেই পাঠের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তখন আরও অনেক সুপ্ত রাজনীতি ধরা পড়ে। আরও অনেক গভীর কথা চলে আসে, যা ওই সুখী গৃহকোণ নেটিজেন জীবন যাপনে অভ্যস্ত মননের বীক্ষণে বোঝা মুশকিল।

আইনের কথা উঠেছে। তাই গোড়াতেই আইনের কথা বলা ভালো। জানেন কি, ২০১৭ সালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট জাস্টিস কেএস পুত্তস্বামী বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলার রায়ে বলেছিল, ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটে স্বপ্রকাশ একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার। আমার অনুমতি ছাড়া এবং সর্বোপরি আমার অগোচরে যদি কেউ আমাকে ইন্টারনেটে প্রচার করে, তবে তা আমার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অক্ষত রাখার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আমি সেই ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারি। আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে ইন্টারনেটে আমার আত্মপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করার। তাই যখন-তখন যাঁকে-তাঁকে ভাইরাল করার আগে একটু ভেবে নেওয়া ভালো। আইনের কথা থাক। নেটিজেনরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপে চুটকি পড়তে অভ্যস্ত। পাঁচশো পাতার রায় পড়ার ধৈর্য কোথায়? তাই আ্যনেকডোটধর্মী কিছু কথাই না হয় বলি। কখনও ভেবেছেন, কোনও এক সকালে উঠে যদি দেখেন, আপনি এক বিপুলসংখ্যক দেশবাসীর মুঠোফোনে বন্দি, আপনার অজান্তেই আপনি ছড়িয়ে গিয়েছেন, (নেটনাগরিকদের ভাষায় ভাইরাল) আপনার কেমন লাগবে? যদি দেখেন, আপনার অজ্ঞতাবশত কৃতকর্মের জন্য আপনি গণশত্রু হয়ে গিয়েছেন, আপনাকে নিয়ে ছড়া কাটা হচ্ছে, কেমন লাগবে? বিখ্যাত অভিনেতার আত্মহত্যার পর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিবিধ আলোচনা হচ্ছে। তাই বলছি, সবার উপহাসের পাত্র হলে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য অসম্ভব সতেজ থাকবে তো? সকালের চায়ের কাপে সুরসিকের মতো হাসতে হাসতে চুমুক দিতে পারবেন তো?

(লেখক উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের গবেষক)