নিঃশব্দেই নয়া বাঁক বৃহন্নলাদের সংসারে

94

তমালিকা দে, শিলিগুড়ি : প্রধাননগর বা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের কাছে ওঁদের ডেরায় একেক দিন নতুন করে জাগে আনন্দ। শোনা যায় নতুন কোনও শিশুর গলার কান্না। নতুন অতিথি। এখন শিলিগুড়ির অনেক বাবা-মা তাঁর সদ্যোজাত তৃতীয় লিঙ্গের সন্তানকে রেখে যাচ্ছেন বৃহন্নলাদের কাছে। বড় করে তোলার জন্য। এককালীন টাকা দিচ্ছেন অনেকে, মাসে মাসে দেখে আসছেন।

বছর কয়েক আগেও এই পরিস্থিতি ছিল চূড়ান্ত অবাস্তব। পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যেত এমন শিশুদের। মা-বাবা নিজেদের অভিশম্পাত দিতেন, আর সম্পর্ক রাখতেন না। শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহার, অনেক শহরই তার সাক্ষী। এখন সেই সন্তানরা শুধু বৃহন্নলা পরিবারে বড় হচ্ছে না, রীতিমতো পড়াশোনা করছে নামী স্কুলে। হাততালি বা ঢোল বাজানোর জীবন নয়, বরং হাতে উঠছে বই।

- Advertisement -

পশ্চিমবঙ্গ ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের সদস্য সোনা দেবী যেমন বলছিলেন, যে কোনও বাচ্চাই ভগবানের রূপ। অনেক বাবা-মা নিজেদের শিক্ষিত বলেন। কিন্তু কিন্নর শিশু জন্ম হলেই তাদের আমাদের কাছে রেখে যান। তবে আমরা কিন্তু এই শিশুদের পালন করার জন্য কোনও টাকা নিয়ে থাকি না। বাবা-মায়েরা খুশি হয়ে যা দিয়ে থাকেন সেটাই নেওয়া হয়ে থাকে। না দিলেও কোনও ব্যাপার না। আমরা নিজেদের সন্তানের মতো তাদের বড় করে তুলছি।

বৃহন্নলা বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এরকম শিশুর সংখ্যা অনেক। দার্জিলিং জেলায় ১০, জলপাইগুড়ি জেলায় ১০, আলিপুরদুয়ারে ২০, কোচবিহারে ১০, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে ১০ জন। যারা রীতিমতো বাংলা ও ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করছে।

বৃহন্নলারা কীভাবে দেখে অবহেলিত শিশুদের? মধু সরকার নামে এক বৃহন্নলা গর্ব করে বলে দিলেন, প্রয়োজনে নিজেরা এক বেলা খেয়ে তাঁদের পড়াশোনার জিনিস কিনে দিয়ে থাকি। চারবছর ধরে এমন এক শিশুকে পালন করেন বৃহন্নলা মালা। বলছিলেন, শিশুটির বয়স যখন একদিন, তখন তার বাবা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। আমি নিজের সন্তানের মতো বড় করছি। এখন একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে নার্সারিতে পড়ে।

মধু আরও ব্যতিক্রমী। তাঁর কাছে চারটি শিশু বড় হচ্ছে। একজনের সাড়ে তিন বছর। একজনের আড়াই বছর। বাকি দুজনের আট এবং এগারো। বেশ খুশি গলায় বললেন, তিনজন স্কুলে পড়ে। তাদের বাবা-মা তাদেরকে রেখে গিয়েছেন। অনেক বাবা-মা ভাবেন কিন্নর শিশু বাড়িতে রেখে কী হবে? তাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

তবে এই কথা ঠিক নয়। তাঁর গলায় গর্ব, এখন পুলিশ, চিকিৎসক, ব্যাংক সব পেশাতেই আমরা রয়েছি। আমাদের কাছে থাকা শিশুরাও যাতে পড়াশোনা করে তাদের স্বপ্নপূরণ করতে পারে, সেজন্য আমরা সমস্ত চেষ্টা করে থাকি।

সোনা দেবীর কাছে পাওয়া গেল আর এক চমকপ্রদ তথ্য। সোনার মন্তব্য, আমরা নিজেদের পরিচয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়ে থাকি। উত্তরবঙ্গজুড়ে বৃহন্নলার কাছে থাকা কিন্নর শিশুরা সমাজের অন্য পাঁচটি শিশু থেকে কোনও অংশে কম নয়। প্রত্যেকটি শিশু এখন স্কুলে পড়ে।

সমাজের এখন সেই নতুন ট্রেন্ড নিয়ে কী বলছেন সমাজতাত্ত্বিকরা? শিলিগুড়ি কলেজের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পালের বিশ্লেষণ, আগে এদের সমাজের স্বীকৃতি ছিল না। এখন সেই স্বীকৃতি পাচ্ছে। চাকরি পাচ্ছে। আগে লোকলজ্জার ভয়ে সন্তানদের কথা গোপন রেখে যেতেন বাবা-মা। এখন পৃথিবী বদলাচ্ছে। তাঁর সংযোজন, এখন বাড়িতে ওদের রাখা হবে না কেন?

সেটা পরের প্রশ্ন। আপাতত কিন্নরদের ঘিরে স্বপ্ন অনেক মহল্লার বয়স্কদের।  নতুন প্রজন্ম ভবিষ্যতে সমাজের কাছে নতুন পরিচিতি তুলে ধরবে। আর ঢোল বা তালি নয়, যৌনকর্মীর জীবনও নয় আর। নিঃশব্দেই নয়া বাঁক আসছে বৃহন্নলাদের সংসারে। সোনা, মধু, মালা-রা সত্যি সত্যি স্বপ্ন দেখছেন, এই মহল্লা থেকেই একদিন বেরোবে ডাক্তার, পুলিশ, ইঞ্জিনিয়াররা।