ভোট দেওয়ার অর্থ খুঁজছেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা

87

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিচয় বহনকারী ভোটার কার্ড হাতে ভোট দেওয়ার স্বীকৃতিটুকুই সার। নাগরিক হিসেবে যে ধরনের সরকারি সুযোগসুবিধার প্রত্যাশায় দিন গোনেন, সেসবের কিছুই জোটে  না বলে আক্ষেপ যেন অফুরান ওই ধরনের মানুষের। তাই শুধু মন খারাপ করে বেঁচে থাকাই এখন যেন তাঁদের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জলপাইগুড়ি জেলায় রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকার আদায়ে ২০০৫ সাল থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রিনা স্টাডি গ্রুপ ফর ডান্স নামে একটি সমাজ সেবামূলক সংস্থার সম্পাদক সৌগত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ভোট আমরা দিচ্ছি বটে। ভোটার কার্ডেও মিলেছে তৃতীয় লিঙ্গের আলাদা স্বীকৃতি। তবে পরিস্থিতির বদল একচুলও হয়নি। নাগরিক হিসেবে যে সুযোগসুবিধার দাবি রয়েছে তা পূরণে কারোরই সময় ও খেয়াল কোনওটাই নেই।

- Advertisement -

জলপাইগুড়ি জেলায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন প্রায় চারশোর মতো। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই এখনও ভোটার কার্ডে নিজেদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে নথিবদ্ধ করাননি। এর কারণ হিসেবে সৌগতর জবাব, কী হবে ওটা করে? হয়রানি আরও বাড়বে বই কমবে না। সে কারণেই অনেকে আগ্রহী নন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সাফ কথা, তাঁদের নিয়ে সরকারের কোনও নীতি নেই। স্কুল নেই। ভাতা নেই। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনওরকমে দিন গুজরান করা ছাড়া তাঁদের আর কিছু করারও নেই। সমাজ থেকে ব্রাত্য করে রাখার ট্র‌্যাডিশনের শুরুটা যে পরিবার থেকেই হয় সেকথাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছেন তাঁরা।

তৃতীয় লিঙ্গের বা অন্য লিঙ্গের পরিচয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ অব্যাহত থাকলেও সামান্য কিছু সুযোগসুবিধার দাবিতে কেউ যে কর্ণপাত করে না তার কিছু দৃষ্টান্তও দিচ্ছেন উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত সৌগত। তিনি বলেন, রূপান্তরকামীদের আত্মপ্রতিষ্ঠিত করতে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা আমাদের সংস্থার মাধ্যমে সাধ্যমতো করা হয়।  প্রশাসনের কাছে নিখরচায় কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থা বা জলপাইগুড়ি পুরসভার কাছে রূপান্তরকামীদের নিয়ে একটি ভাতের হোটেল চালুর জায়গা চাওয়া হয়েছিল। সেসবের কিছুই মেলেনি। সরকারি কোচিং সেন্টারে রূপান্তরকামী পড়ুয়াদের জন্য আলাদা করে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা এমনকি বাসস্ট্যান্ডে আলাদা শৌচালয়ে সামান্য আর্জিও পূরণ হয়নি। এ থেকেই পরিস্থিতিটা অনুমান করে নেওয়া যায়।

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশের পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকার ও আলাদা পরিচয়ে বিষয়টিতে আগের থেকে গতি এলেও সমাজ সংস্কারের এখনও বহু কাজ বাকি আছে বলে রূপান্তরকামীরা মনে করেন। যার শুরুটা নিজের বাড়ি থেকেই হওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন। এখনও বাবা-মাযো তাঁদের ওই ধরনের সন্তানদের মন থেকে মেনে নিতে চান না বলে ভূরিভূরি নজির রয়েছে। অনেকেই বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শিলিগুড়ির উত্তর ফাল্গুনী সোসাইটির সভাপতি প্রবীর ঘোষ বলেন, স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড করানোর জন্য প্রশাসন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেই মোতাবেক আলাদা করে ফর্ম দেওয়া হলেও ছবি তোলার সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। এই ধরনের মানুষদের যে অনেকেই এড়িয়ে চলেন সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। লাইনে আমাদের দেখে অন্যরা পালিয়ে যাওয়া শুরু করলে অনেকেই ছবি না তুলেই ফিরে আসেন। এই তো অবস্থা।

জলপাইগুড়ির আকাশ বসুর মন্তব্য, সবার আগে মানুষকে এটা বুঝতে হবে, রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের সঙ্গে পোশাক-আশাকের কোনও সম্পর্ক নেই। ভুল ধারণা আমাদের আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। নিজের পরিচয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেও সমাজের কাছ থেকে অধিকার কবে মিলবে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।