মৃত্যুর এই ছবি ফিরে ফিরে আসবে

রহিত বসু : করোনা সংক্রামিত হয়ে প্রাত্যহিক মৃত্যুমিছিলের মাঝে ভাইজ্যাগে গ্যাস লিকে মৃত্যুর ঘটনা ঘরবন্দি জীবনে কিছুটা বৈচিত্র‌্য এনেছিল। সেই মৃত্যু ভুলে রবীন্দ্র জয়ন্তীতে মেতে উঠতে না উঠতেই আরও একটি মৃত্যুর খবর এসে গেল। রেললাইনে জামাকাপড়-চটি-রুটি-রক্তমাংস ছড়িয়ে থাকার এই ছবি অবশ্য সহজে মাথা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নয়। এই ছবি স্বপ্নকেও গ্রাস করবে।

তাহলে কি ঘরে ফেরার জন্য পরিযায়ী শ্রমিকের অনন্ত হাঁটার কর্মসূচি থেমে যাবে? না। তাঁরা এগিয়ে চলবেন ঘর অভিমুখে, দরকার হলে হেঁটেই। ঘর নামক চার দেওয়ালের কাছে ফিরতে তাঁরা এতটাই মরিয়া। তাঁরা এমন এক সমাজের সন্তান, যে সমাজ তাঁদের শোষণ করেছে, অপমান করেছে এবং প্রতি মুহূর্তে তাঁদের অস্তিত্বকে খেলো করে দেখিয়েছে। অথচ এই পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার কর্মসূচিই পুঁজিপতিদের বুকে কাঁপন ধরিয়েছে। কর্ণাটকে দেখলেন না, বিল্ডার লবি এতটাই প্রভাবশালী যে, সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে পরিযায়ীদের ঘরে ফেরার পথ আটকে দিল! লকডাউনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে এসে তাই চর্চা শুরু হয়েছে, করোনা আতঙ্ক স্তিমিত হওয়ার পর পরিযায়ী শ্রমিকরা যদি কাজে না ফেরেন তাহলে অর্থনীতি কতটা বিপর্যস্ত হবে?

- Advertisement -

কিন্তু আমি বলব, এ সব অবাস্তব জল্পনা। পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজে না ফিরে করবেনই বা কী? যদি কিছু করার উপায় থাকত তাহলে কি ঘরদোর ছেড়ে তাঁরা অজানা-অচেনা জায়গায় পড়ে থাকতেন? অতএব তাঁরা ফিরবেন বড় বড় শহরে, বড়লোকের বাড়িতে অথবা অফিসে, সড়কে অথবা কারখানায়। যতই পরিয়াযী শ্রমিকদের খেলো করুন না কেন, ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছোনোর লক্ষ্যে তাঁরাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

অনেকে হয়তো বলবেন, একটা দুর্ঘটনায় দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির কীই বা যায় আসে! হাজারো ঘটনার ভিড়ে এটি আরও একটি ঘটনা মাত্র। আমাদের জীবনে প্রতি বছর এমন কত দিন আসে! কিন্তু আমি বলব, রেললাইনের ওই ছবি ফিরে ফিরে আসবে। আপনি অর্থনীতি জানুন বা না জানুন, সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব জানা থাক বা না থাক, এটা তো নিশ্চয়ই বুঝেছেন যে, লকডাউনে গরিব এবং পিছিয়ে পড়া মানুষকে কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কত কোটি পরিযায়ী শ্রমিক যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে রয়েছেন, তার হিসেব নেই। আমাদের কাছে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বার্তা আসছে। কেউ অফিসের ফোনে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, কেউ আমাদের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বার্তা পাঠাচ্ছেন। অসহায় শ্রমিক ও পড়ুয়াদের ধারণা, আমাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করি। মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরাই তো আমাদের কাজ। কিন্তু সরকার তো চলে সরকারের মতো, তাদের অনেক অঙ্ক কষে চলতে হয়।

কিন্তু নেতাদের আমি বলব, সারা বছর অত অঙ্ক কষার দরকার কী? শুধু ভোটের আগে কষলেই তো হয়। এতগুলো মানুষের মৃত্যুর পর শুধু শোকবার্তা না পাঠিয়ে একবার খোঁজ নিয়ে দেখলেই তো হয়, ক্ষুধা, ক্লান্তি, আত্মহত্যা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কারণে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে? কতজন লকডাউনে স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ নিতে না পেরে মারা গিয়েছেন? কেউ কি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, অন্ধকার নোংরা বস্তিতে পানীয় জলের সংকটে কত মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে? দোষারোপের খেলা বন্ধ করে নেতারা যদি মনে রাখতেন, আমাদের দেশের ইতিহাসে এমন মানবিক সংকট আগে কখনও এসেছে কি না সন্দেহ, তাহলে মানুষের কল্যাণ হত।