স্কুল বন্ধ, এবার সরস্বতীপুজো নিয়ে শঙ্কায় সনাতনরা

266

সানি সরকার ও রণজিৎ বিশ্বাস, শিলিগুড়ি ও রাজগঞ্জ : স্কুলে গিয়ে পরীক্ষায় বসার বয়সটা ওঁদের অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে স্কুলের গেটে তালা। আগামী দুসপ্তাহের মধ্যে এই তালা না খুললে তাঁদের বিরাট পরীক্ষায় বসতে হবে বলে রমেন, সনাতনরা স্পষ্টই বুঝতে পারছেন। সরস্বতীর মধ্যে দিয়ে প্রতি বছর যে লক্ষ্মীলাভ হয়, তা তো হবেই না, উপরন্তু অর্থ-পরিশ্রম সবই যে জলে যাবে তা তাঁদের কাছে পরিষ্কার। সরস্বতীপুজো নিয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি না হওয়ার বিষয়টি তাঁদের বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে।
রাজগঞ্জের ফুলবাড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক অভিষেক রায় বলেন, করোনার জন্য স্কুল বন্ধ থাকায় এ বছর সরস্বতীপুজোর জন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়নি। এছাড়া সরস্বতীপুজোর বিষয়ে শিক্ষা দপ্তর থেকে কোনও নির্দেশিকা জারি করা হয়নি। সরস্বতীপুজোর আগে স্কুল খুললে কোনওরকমে পুজো করা হবে, নইলে নয়। কৈমারি সুখানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রণজিৎ মণ্ডল বলেন, স্কুল এখনও খোলেনি। কবে খুলবে জানা নেই। এই পরিস্থিতিতে স্কুলে সরস্বতীপুজো হবে কি না সে বিষয়ে আমরা কোনও নির্দেশিকা পাইনি। রাজগঞ্জের সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক রাজীব চক্রবর্তী বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের স্কুলে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতে স্কুলে সরস্বতীপুজো হবে কি না সে বিষয়ে রাজ্য শিক্ষা দপ্তর থেকে এখনও কোনও নির্দেশিকা আসেনি। এলে সেইমতো স্কুলগুলিকে জানিয়ে দেওয়া হবে। শিলিগুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের চেয়ারম্যান সুপ্রকাশ রায় অবশ্য বলেন, স্কুল খোলার বিষয়ে এখনও কোনও নির্দেশিকা না এলেও স্কুলগুলি পুজোর আযোজন করতেই পারে। এই ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা নেই। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষগুলিকে স্বাস্থ্যবিধির দিকে নজর রাখতে হবে।
করোনা ট্রেনে-বাসে চড়ে না। এমনকি চায়ের দোকান বা রেস্তোরাঁতে যায় না। সবসময় শুধু পড়াশোনা করে, তাই স্কুল বন্ধ। মাসের পর মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ থাকায় এই কটাক্ষ-মিমটি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবে স্কুল খুলবে তা সংশ্লিষ্ট সমস্ত মহলই খোঁজার চেষ্টা করছে। স্কুল বন্ধ থাকায় বিভিন্ন মহলের মতো মৃৎশিল্পীরাও সমস্যায় পড়েছেন। দুর্গাপুজো, কালীপুজোয় বিপর্যয়ের পর তাঁরা সরস্বতীপুজোর দিকে তাকিয়ে থাকলেও স্কুল বন্ধ থাকায় তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। শিলিগুড়ি কুমোরটুলির সনাতন পাল বলেন, হাতেগোনা কয়েকটা ছাড়া কোনও বছরই অধিকাংশ মূর্তির বায়না হয় না। কিন্তু সমস্ত প্রতিমাই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু স্কুলগুলি বন্ধ থাকায় এই বছর কী হবে বুঝতে পারছি না। পুজো না হলে সমস্ত পরিশ্রমই মাঠে মারা যাবে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ থাকায় এই বছর তিনি সরস্বতী প্রতিমা তৈরি করেননি বলে নিরঞ্জন পাল জানান। তিনি বলেন, কালীপুজোর সময় প্রচুর টাকার ক্ষতি হয়েছে। মাটি, রং, গয়নার দাম এতটাই বেড়েছে যে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাইনি। শান্তিনগরের স্মরজিৎ মালাকার বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায় প্রচুর পুজো হয়। পাড়ার অনেক ক্লাবই আমার এখান থেকে প্রতিমা নেয়। জানি না এবার কী হবে। যদি পাড়ার পুজোগুলিও না হয় তবে খাটনি ও টাকা, দুই-ই জলে যাবে। নৌকাঘাট এলাকার মৃৎশিল্পী রমেন পালের বক্তব্য, স্কুলে সরস্বতীপুজো না হওয়ার ঘটনা আজ পর্যন্ত ঘটেনি। কিন্তু এ বছর কী হবে বুঝতে পারছি না। রাজগঞ্জের মৃৎশিল্পী ভানু পাল বলেন, দুর্গাপুজো, কালীপুজোয় তেমন ব্যবসা হয়নি। তাই সরস্বতীপুজোই ভরসা ছিল। কিন্তু গতবারের তুলনায় এবার এখনও পর্যন্ত তেমন বায়না আসেনি। তার উপর প্রতিমা তৈরির সামগ্রীরও দাম অনেক বেড়েছে। সেই তুলনায় প্রতিমার দাম মিলছে না। কীভাবে সংসার চলবে তা ভেবে কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি না। আমরা সরকারি আর্থিক সাহায্যের দাবি জানাচ্ছি।