নয় কেন্দ্রেই এবার কঠিন লড়াই কোচবিহারে

188

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : প্রার্থী ঘোষণার পরই কোচবিহারের নটি আসনে জয়-পরাজয়ে অঙ্ক দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছিল, কে কোন আসনে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছে। তাতে মোটের উপর জেলায় গেরুয়া রংয়ে বাড়বাড়ন্তের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ভোটের ১৭ দিন আগে দুই দল সমানে সমানে লড়াই করছে। ফলে কোচবিহারে তৃণমূল ও বিজেপির কোন দল কয়টি আসন পাবে তা বলা এই মুহূর্তে কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে।

রবি-মিহির মগজের লড়াই
দুই অভিজ্ঞ প্রবীণ রাজনীতিবিদের মগজাস্ত্রের লড়াই দেখবে নাটাবাড়ি। জেলা তৃণমূলের দুই প্রাক্তন সভাপতির লড়াই এখানে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেন্দ্রটিতে রবিবাবু  ১৬ হাজারের বেশি ভোটে জয় পেলেও গত লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্রটিতে সাড়ে ১৮ হাজারের বেশি ভোটে পিছিয়ে পড়ে তৃণমূল। এখানে বিজেপি তাদের সাংগঠনিক শক্তি এতটাই মজবুত করেছে যে লোকসভা নির্বাচনের পর বেশ কিছুদিন রবিবাবু তাঁর নিজের কেন্দ্রে ঠিকমতো ঢুকতে পারেননি। তবে করোনা পরিস্থিতিতে রবিবাবু দিনরাত মানুষের পাশে থেকে, খাবার দেওয়া সহ নানাভাবে তাঁদের সাহায্য করে হারানো জমি অনেকটাই উদ্ধার করেছেন। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসা মিহির গোস্বামীও কম যাচ্ছেন না। তাঁর সভাগুলিতে যেভাবে লোক হচ্ছে তাতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকছে।

- Advertisement -

অভিজিতের দাপট বনাম নিখিলের অভিজ্ঞতা
কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা পরিস্থিতি সম্ভবত সবচেয়ে জটিল। তৃণমূলের টিকিটে জেতা এই কেন্দ্রের বিধায়ক মিহির গোস্বামী এবার এই কেন্দ্র ছেড়ে নাটাবাড়িতে বিজেপির প্রার্থী। মিহিরকে গদ্দার বলে তুলে ধরা তৃণমূলের প্রচারে অন্যতম কৌশল এখানে। তবে এখানে হারজিতের চাবিকাঠিই হচ্ছে শহরের ভোট। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এখানে তৃণমূল জিতলেও শহরে এসে অনেকটা পিছিয়ে পড়ায় জয়ের ব্যবধান অনেকটা কমে যায়। গত লোকসভা নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে তৃণমূল এই কেন্দ্রের নয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে প্রায় ১৬ হাজার ভোটের লিড নিয়ে এলেও শহরে ২২ হাজার ভোটে পিছিয়ে পড়ে। শহরের ভোট দখল করতে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের জেলা সভাপতি দাপুটে নেতা অভিজিত্ দে ভৌমিক (হিপ্পি)-এর উপর ভরসা রাখছে দল। হিপ্পি-র ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নিয়ে শহরে বিতর্ক থাকলেও ছাত্রমহলে তাঁর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিজেপি তাদের প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা অভিজ্ঞ বর্ষীয়ান নেতা নিখিলরঞ্জন দে-কে প্রার্থী করেছে। ঠান্ডা মাথায় ভোট পরিচালনার কৌশল জানেন তিনি।

পেশিশক্তির লড়াই দিনহাটায়
কোচবিহার জেলায় সবচেয়ে বেশি প্রায় তিন লক্ষ ভোটার রয়েছেন দিনহাটা কেন্দ্রে। ২০১৬ সালে উদয়ন গুহ প্রায় ২২ হাজার ভোটে জিতে এখান থেকে বিধায়ক হন। গত লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। গত পাঁচ বছরে দিনহাটার রাজনৈতিক সমীকরণে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তৃণমূলের যুবনেতা নিশীথ প্রামাণিককে সামনে রেখে তৎকালীন তৃণমূল যুব কংগ্রেসের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায় তখন উদয়ন-রবি জুটিকে কার্যত নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিলেন। রাজনীতির খেলায় পার্থ এখন তৃণমূলের জেলা সভাপতি আর নিশীথ তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে গেরুয়া জার্সি গায়ে এখন বিজেপির সাংসদ।
শাসকদলের সামগ্রিক উন্নয়ন ও উদয়ন গুহর জনসংযোগ যথেষ্ট ভালো থাকলেও এখানে তৃণমূলের অন্যতম মাথাব্যথা দলে মারাত্মক গোষ্ঠীকোন্দল। এখানে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি যথেষ্ট ভালো। তবে সাংসদকে এখানকার ভোটাররা বাহুবলী হিসাবে যতটা সমঝে চলেন ততটা কাছে ঘেঁষেন না। জনসংযোগে ঘাটতি রয়েছে সাংসদের। তবে মাসল গেমে এখানে উদয়ন-নিশীথের টক্কর হবে সেয়ানে-সেয়ানে, তার আভাস মিলছে গত কয়েকদিন ধরেই। প্রতিদিনই সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দিনহাটার গ্রাম এলাকা।

গিরিনের ভাবমূর্তি বনাম বিজেপির সংগঠন
প্রাথমিকভাবে মাথাভাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি বেশ কিছুটা এগিয়ে ছিল। ২০১৬ সালে কেন্দ্রটি থেকে তৃণমূল প্রার্থী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন ৩২ হাজারের বেশি ভোটে জয় পেলেও গত লোকসভা নির্বাচনে এখানে ২১ হাজারের বেশি ভোটে পিছিয়ে পড়ে তৃণমূল। এরপর থেকে এখানে বিজেপি তাদের সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত করেছে। পরিস্থিতি এমন হয় যে তৃণমূল সেখানে তাদের বিধায়ক তথা মন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মনকে পর্যন্ত দাঁড় করানোর সাহস পায়নি। ফলে বিজেপি অনায়াসে জয় পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হয়েছিল।
কিন্তু স্বচ্ছ ভাবমূর্তি থাকা হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক গিরীন্দ্রনাথ বর্মনকে তৃণমূল প্রার্থী করায় লড়াই জমে উঠেছে। গিরীন্দ্রবাবু পঞ্চানন বিশ্ববিদ্যালয় মাথাভাঙ্গার খলিসামারিতে করার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি কোচবিহারে হওয়ায় তার দ্বিতীয় ক্যাম্পাস সেখানে করার জন্য টানা দশ বছর আন্দোলন করেছেন। অবশেষে কিছুদিন আগে সেখানে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস করার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। এবার গিরিনবাবুকে প্রার্থী করে তাঁর সাফল্যের ফল পেতে পারে তৃণমূল। অপরদিকে, বিজেপি প্রার্থী করেছে পেশায় কৃষক সুশীল বর্মনকে। তাঁরও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। মানুষের কাছে তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে।

তৃণমূলের জেলা সভাপতির কঠিন লড়াই
শীতলকুচি বিধানসভাতেও এবার দুই শিক্ষকের লড়াই হতে যাচ্ছে।  তৃণমূল এখানে বিধায়ক হিতেন বর্মনের পরিবর্তে প্রার্থী করেছে দলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়কে। পেশায় তিনি হাইস্কুলের শিক্ষক। উপনির্বাচনে জিতে তিনি এর আগে সাংসদ হলেও পুরোদস্তুর ভোটের লড়াইয়ে এবারই তিনি প্রথম নামলেন। তৃণমূল প্রার্থীতালিকা আগে ঘোষণা করায় প্রথম কয়েকদিন একতরফা তিনি প্রচার করেছেন। ভাবমূর্তিও পার্থর যথেষ্ট ভালো। তবে তিনি কতটা চাপে, তা বোঝা যাচ্ছে প্রচারে। মঙ্গলবার কুর্শামারির বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ময়নাতলিতে গিয়ে হাসিমুখে তামাকের ঠেলা টানলেন পার্থ। এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের খবর নিলেন। তাঁর বিপরীতে বিজেপি প্রার্থী করেছে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বরেনচন্দ্র বর্মনকে। তাঁরও যথেষ্ট স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। এখানে বিজেপির সংগঠনও ভালো। ফলে দুই শিক্ষকের কেউই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন।

দুই পোড়খাওয়া নেতার লড়াই
পরেশ অধিকারী বনাম দধিরাম রায়। ফরওয়ার্ড ব্লকের দুই প্রাক্তন জার্সি বদলে মুখোমুখি লড়াইয়ে। পরেশবাবু বাম রাজনীতিতে কয়েক দশক কাটিয়ে তৃণমূলে এসেছেন। মেয়ের চাকরি নিয়ে তিনি বড়সড়ো বিতর্কে জড়িয়েছেন। তাঁকে লোকসভায় প্রার্থী করার খেসারত দিয়েছে তৃণমূল। তার পরেও তাঁকে বিধানসভা প্রার্থী করছে তৃণমূল। অন্যদিকে, কেন্দ্রটিতে বিজেপি প্রার্থী করেছে পেশায় ব্যবসায়ী তথা দলের মণ্ডল সভাপতি দধিরাম রায়কে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেন্দ্রটি তৃণমূল ৬০০০ ভোটে জয় পেলেও গত লোকসভা ভোটে কেন্দ্রটিতে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি কেন্দ্রটিতে যথেষ্ট ভালো। বিজেপিতে দক্ষ সংগঠক বলেও দধিরামের সুনাম রয়েছে।

মন্ত্রীর অগ্নিপরীক্ষা
তৃণমূলের ভরা সময়ে কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে তারা জিততে পারেনি। গত বিধানসভা নির্বাচনে এখানে বাম প্রার্থী নগেন্দ্রনাথ রায় জয়ী হন। বিদাযি বিধায়ক তিনি। তবে গত লোকসভা নির্বাচনে এখানে তৃণমূলের থেকে ২৭ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। বিজেপি প্রার্থী করেছে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক সুকুমার রায়কে। অপরদিকে, তৃণমূল তাদের মাথাভাঙ্গার বিধায়ক তথা অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মনকে পরীক্ষায় নামিয়েছে। মাথাভাঙ্গা থেকে কোচবিহারে উত্তর কেন্দ্রে এসে বিনয়বাবুর অস্বস্তি এতটুকু কমেনি।  বরং বিজেপি এখানে সামান্য এগিয়ে শুরু করবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মন্ত্রীর মান বাঁচাতে তৃণমূল কর্মীরা এখানে কতটা জান লড়িয়ে দেবেন তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

বিজেপির কোন্দলে তৃণমূলের আশা
গত লোকসভা নির্বাচনে জেলায় ভরাডুবি হলেও সিতাইয়ে তৃণমূল প্রায় ৩৫ হাজার ভোটে বিজেপির থেকে এগিয়ে ছিল। অথচ ভোটে নিশীথ প্রামাণিক জেতার পর এক মাসেরও বেশি সময় বাড়িছাড়া ছিলেন তৃণমূল বিধায়ক জগদীশ বর্মাবসুনিয়া। এবারও জগদীশবাবু দলের প্রার্থী। তাঁর কাছে এবার সম্মান বাঁচানোর লড়াই। বিজেপি এখানে প্রার্থী করেছে দীপক রায়কে। এই প্রার্থীকে ঘিরে দলের একাংশের মধ্যেও যথেষ্ট অসন্তোষ রয়েছে। আর সেটাই তৃণমূলের আশা বাড়াচ্ছে।

বহিরাগত প্রণবে সুবিধা মালতীর
তুফানগঞ্জে বিজেপি সাংগঠনিক শক্তি বেশ ভালো। তার ভরসাতেই এবার এখানে দল প্রার্থী করেছে তাদের জেলা সভাপতি মালতী রাভাকে। তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের শালবাড়ির তল্লিগুড়িতে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। ২০০১ ও ২০০৬ সালে এখান থেকেই তিনি বিধানসভা ভোটে বিজেপির টিকিটে লড়েছেন। মাটি কামড়ে দু-দশক ধরে এখানে পড়ে থেকে তিনি রাজনীতি করছেন। অন্যদিকে তৃণমূল এখানে প্রার্থী করেছে প্রণবকুমার দেকে। তিনি দাপুটে নেতা হলেও আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দা হওয়ায় প্রার্থীকে নিয়ে দলের অন্দরে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। আর এই ক্ষোভটাই মালতী তথা বিজেপিকে বড় ভরসা দিচ্ছে।