বর্ণান্ধ হয়েও নিখুঁত লক্ষ্যভেদ ডেলানির

কোপেনহেগেন : তিনি বর্ণান্ধ। খেলার মাঠে কে সতীর্থ আর কে প্রতিপক্ষ তা বুঝতে সমস্যায় পড়েন। কিন্তু সতীর্থের কর্নারে নিখুঁত হেডে গোল করতে কোনও সমস্যা হয় না ডেনমার্কের মিডফিন্ডার টমাস ডেলানির।

ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর গোলেই চেক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে এগিয়ে গিয়েছিল ডেনমার্ক। ম্যাচের সেরাও নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু ডেলানির জীবনে সবকিছু ওই হেডারের মতো নিখুঁত নয়। বর্ণান্ধ হওয়ায় রং বুঝতে সমস্যায় পড়েন। তাঁর কথায়, বিষয়টি বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমার নজরে সবকিছু একই রংয়ের বিভিন্ন শেড মনে হয়। তাই খেলার সময় বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন তিনি। বললেন, সাধারণত দুটি দল আলাদা রংয়ের প্যান্ট পরে নামে। সেক্ষেত্রে কে সতীর্থ আর কে প্রতিপক্ষ তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। তবে একবার দুদলই সাদা প্যান্ট পরা ছিল (মেক্সিকো ম্যাচে)। সেসময় খুব সমস্যা হয়েছিল। তাই এখন সতীর্থদের মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটাও দ্রুত করতে হয়, প্রতিপক্ষ বল ছিনিয়ে নেওয়ার আগেই।

- Advertisement -

দেশের জার্সিতে ডেলানির প্রথম বড় প্রতিযোগিতা ছিল রাশিয়া বিশ্বকাপ। তিন বছর আগে বিশ্বকাপের মধ্যেই নিজের সমস্যার কথা জোরগলায় ঘোষণা করেন। প্রস্তুতির জন্য মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলেছিল ডেনমার্ক। ম্যাচের পর এক বর্ণান্ধ সমর্থক জানিয়েছিলেন, দুদলের জার্সির রং বুঝতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাঁকে। ওই সমর্থকের পাশে দাঁড়াতে নিজেই একটি ড্যানিশ রেডিও স্টেশনে ফোন করেন। লাইভ সম্প্রচারের মধ্যে তিনি বলেন, আমার নাম টমাস। আমি বর্ণান্ধ এবং এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমারও মাঠে কে আমার সতীর্থ আর কে বিপক্ষ দলের তা বুঝতে সমস্যা হয়েছে। তিনি কোন দলের হয়ে খেলেন প্রশ্ন করা হলে স্পষ্ট জবাব, ডেনমার্কের জাতীয় দলে।

এই ঘোষণার পর শুধু সতীর্থই নয়, প্রতিপক্ষকেও পাশে পেয়েছিলেন ডেলানি। তাঁর সুবিধার জন্য ডেনমার্ক-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে দুপক্ষই অ্যাওয়ে জার্সি পরে খেলে। এই সম্মানে আপ্লুত ডেলানির বক্তব্য, ওরা চাইলেই নিয়মের দোহাই দিয়ে আমার সমস্যার সুবিধা নিতে পারত। আমি হলুদ রং (অস্ট্রেলিয়ার জার্সির রং) হয়তো বুঝতেই পারতাম না। এমনিতে লাল ও সবুজ রংয়ের তফাৎ করতে পারেন না ডেলানি। কাকতালীয়ভাবে ডেলানির দেশ ডেনমার্ক লাল, বর্তমান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড হলুদ এবং প্রাক্তন ক্লাব ওয়েডার ব্রেমেন সবুজ রংয়ের জার্সি পরে খেলে।

ডেলানির রসবোধ যে ভালো, তা বোঝা গিয়েছে চেক ম্যাচের শেষে। সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে মজা করে তিনি বলেন, আমরা স্ট্র‌্যাটেজি তৈরিতে মন দিয়েছিলাম। তবে হেডটা অন্য একজনের নেওয়ার কথা ছিল। এর বেশি আমি আর কিছু বলতে পারব না। অসুস্থ হয়ে ইউরো থেকে ছিটকে যাওয়া সতীর্থ ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনকে এই জয় উৎসর্গ করে বলেন, গত কয়েক বছরে ও আমাদের সেরা ফুটবলার। আমরা ওকে বুকে নিয়ে খেলছি। ওকে গর্বিত করতে পেরে দলের সকলেই খুশি।

ডেলানি এখন বিশ্বের প্রায় ৩৫ কোটি বর্ণান্ধের জন্য আশার আলো। এই সমস্যা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত ব্রিটেনের সমাজকর্মী ক্যাথরিন অ্যালবানি-ওয়ার্ডের কথায়, টমাস ডেলানি প্রথম তারকা ফুটবলার যিনি এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন। ওঁ যে কী করেছেন, তা নিজেও জানেন না। কারণ অধিকাংশই দর কমে যাওয়ার ভয়ে এই বিষয়ে কথা বলতে ভয় পান।

অবশ্য ডেলানির মাথায় এখন শুধুই ইংল্যান্ড-বধ।