প্রশাসনিক গাফিলতি, তিস্তা সেচপ্রকল্পের বহু হাজার একর জমি বেহাত

360

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : তিস্তা সেচপ্রকল্পের জন্য অধিগৃহীত কয়েক হাজার একর সরকারি জমির হদিস মিলছে না। উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ সেচখাল প্রকল্পের জমি কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে। জানা যাচ্ছে, প্রশাসনিক গাফিলতির সুযোগে অধিগৃহীত সরকারি জমি ব্যক্তিগত নামে নথিভুক্ত করে লক্ষ লক্ষ টাকায় সেগুলি বিক্রি করে দিয়েছে একটি বড় জমি মাফিয়া চক্র। ভূমি সংস্কার, সেচ দপ্তরের একটা অংশও সেই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। কয়েক বছর আগে অধিগৃহীত জমির মিউটেশনের কাজ শুরু হতেই এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। সাতের দশকে অধিগ্রহণ করা হলেও কেন এত বছর পর সেগুলির মিউটেশনের কাজ শুরু করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেকায়দায় পড়ে কেলেঙ্কারির দায় একে অপরের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে সেচ এবং ভূমি সংস্কার দপ্তর।

অধিগৃহীত জমির মিউটেশন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজকর্ম করার জন্য কয়েক বছর আগে টেন্ডারের মাধ্যমে একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছিল তিস্তা সেচপ্রকল্প কর্তৃপক্ষ। আজ পর্যন্ত যে পরিমাণ অধিগৃহীত জমির প্রামাণ্য নথি তাদের হাতে রয়েছে, সেই পরিমাণ জমিই মিউটেশনের জন্য টেন্ডারে উল্লেখ করেছিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সেই হিসেব অনুসারে, জলপাইগুড়ি জেলায় ২৫৩৭.১০ একর, দার্জিলিং জেলায় ২২৫৮.৩৪ একর এবং উত্তর দিনাজপুর জেলায় ৩২০৯.৭৮ একর জমির মিউটেশনের নথি প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কোচবিহার জেলার হলদিবাড়িতে খালের জন্য প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও মাত্র ৯০ একরের নথি উদ্ধার করতে পেরেছিল সেচ দপ্তর।

- Advertisement -

য়ে সংস্থাকে মিউটেশনের কাজের বরাত দিয়েছিল তিস্তা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ, সেই সংস্থার পদস্থ কর্তা ও প্রাক্তন ভূমি সংস্কার আধিকারিক শ্যামল দাস জানিয়েছেন, জলপাইগুড়িতে ৩২৩.২৬ একর জমির মিউটেশনের জন্য নথি জমা দিয়েছিলেন তাঁরা। বাকি ২২১৩.৮৪ একর জমির কোনও নথি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দার্জিলিং জেলায় অবশ্য অধিগৃহীত পুরো জমির মিউটেশনের আবেদন জমা পড়েছে। তবে আজ পর্যন্ত মাত্র ৬২০ একরের মিউটেশন হয়েছে। বাকি জমির নথি তাঁরা মেলাতে পারছেন না বলেই জানিয়েছেন ভূমি সংস্কার দপ্তরের কর্তারা। উত্তর দিনাজপুর জেলায় এখন পর্যন্ত ২৮৬২.৩২ একর জমির মিউটেশনের কাগজ জমা দিয়েছে ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। তবে মিউটেশন হয়েছে মাত্র ৩০০ একরের। এখানে ২৫৬২.৩২ একর জমির নথি মেলাতে পারছে না সেচ ও ভূমি  সংস্কার  দপ্তর।

তিস্তা সেচপ্রকল্পের মূল খালের ডানে ও বাঁয়ে অসংখ্য  ছোট  খাল রয়েছে। এগুলি  দিয়ে  তিস্তার  জল  কৃষকের  চাষের  জমিতে  পৌঁছে  যাওয়ার  কথা। প্রকল্প রূপায়ণের জন্য উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যে  বিপুল পরিমাণ জমি অধিগৃহীত হয়েছিল,  সেগুলির সব এখনও পর্যন্ত সেচ দপ্তরের নামে নথিভুক্ত হয়নি। আর সেই সুযোগে সরকারি জমি লুট করেছে একদল মাফিয়া।

তিস্তা সেচপ্রকল্পের জন্য কত জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তার সঠিক কোনও হিসাব এখনও পর্যন্ত বের করতে পারেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সূত্রের খবর, অধিগ্রহণের দীর্ঘ সময় পর মিউটেশনের কাজ শুরু হওয়ায় পুরোনো নথি খুঁজে পাচ্ছে না তারা। তাছাড়া যখন জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তখন গেজেট নোটিফিকেশন হয়েছিল পুরোনো দাগ নম্বর অনুসারে। পরবর্তী সময়ে দাগ নম্বর বদলে যাওয়ার ফলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ভূমি  সংস্কার দপ্তরের এক পদস্থ আধিকারিক বলেন, সরকার টাকা দিয়ে জমি কিনেছিল। অথচ বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনকালে কোনও এক অদ্ভুত কারণে সেই জমি নিজেদের নামে নথিভুক্ত করেনি। ফলে যিনি জমি বিক্রি করেছেন, ভূমি  ও ভূমি  সংস্কার দপ্তরের খাতায় তিনি পরবর্তী সময়ে মালিক হিসাবে থেকে গিয়েছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে ওই জমি ফের বিক্রি করতে পেরেছেন। ওইভাবেই হাজার হাজার একর সরকারি জমি ইতিমধ্যেই বেহাত হয়ে গিয়েছে।

তিস্তা সেচপ্রকল্পের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অমিত রায় বলেন, গোটা বিষয়টিতে অনেক জটিলতা আছে। আমরা সবটা খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করব। উত্তর দিনাজপুরের ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক প্রদীপ গিরি বলেন, বিভিন্ন ব্লকে সেচপ্রকল্পের জমি আছে। নথি নিয়ে অনেক সমস্যা আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাতে মিউটেশন করে দেওয়া যায় আমরা সেই চেষ্টা করছি।