দৃষ্টিহীন কিশোরের গায়ক হবার স্বপ্ন পূরণ করতে উদ্যোগী তিন সংগীতপ্রেমী

277

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: দৃষ্টিহীন কিশোর মহম্মদ হায়দার আলির স্বপ্ন গায়ক হবার। কিন্তু কিশোরের সেই স্বপ্নপূরণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্রতা। সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয়নি বলে ছেলেকে একটা হারমোনিয়ামও কিনে দিতে পারেননি বাবা শেখ আনসার আলি। সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়েই মনের এই দুঃখের কথা সবাইকে শোনাতো হায়দার। গায়ক হবার স্বপ্নে বিভোর দৃষ্টিহীন এক কিশোরের সেই বেদনাভরা গান ব্যাথিত করেছিল হাবড়ার অশোকনগর নিবাসী সংগীতপ্রেমী রিয়া রুবি মহাশয়াকে। তাই তিনি নিজের জন্মদিনের অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়ে সেই অর্থে হায়দারকে কিনে দিলেন নতুন একটি হারমোনিয়াম। নতুন হারমোনিয়াম পেয়ে এখন আনন্দে আত্মহারা দৃষ্টিহীন হায়দার। সে জানিয়েছে, এবার তার কাজ হবে হারমোনিয়ামের সুরে সুর মিলিয়ে গানের জগতে নিজেকে মেলে ধরা।

দৃষ্টিহীন কিশোর হায়দারের বাড়ি পূর্ব বর্ধমানের গুসকরার আলুটিয়ার গ্রামে। হায়দারের বাবা শেখ আনসার আলি পেশায় রাজমিস্ত্রী। মা হাফিজা বেগম সাধারণ গৃহবধূ। হায়দাররা তিন ভাই, তিন বোন। বড় দুই দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছোট দিদি মোমিনা খাতুনের এখনও বিয়ে হয়নি। এক দাদা ও বাবার সামান্য রোজগারেই হায়দারের পরিবারের সকলের অন্নসংস্থান হয়।

- Advertisement -

আনসার আলি জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে হায়দারের বর্তমান বয়স ১৪ বছর। ছোট থেকেই সে দৃষ্টিহীন। আনসার আলি জানান, অনেক ছোট বয়স থেকেই গান বাজনার প্রতি হায়দারের আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ওই সময়ে ছেলে কান্নাকাটি শুরু করলে ওকে রেডিও-র গান শোনালেই কান্নাকাটি বন্ধ হয়ে যেত। পরে একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হায়দার নিজের মনে মনেই গানগাইতে শুরু করে। এখন মোবাইলে বিভিন্ন শিল্পির কণ্ঠে গান শুনে তা আয়ত্ত করে নিয়ে হায়দার নিজেই সুমধুর কণ্ঠে সেই গান গায়। আনসার আলি জানান, গান শেখার জন্য ছেলের যে একটা হারমোনিয়ামের প্রয়োজন তা তিনি বোঝেন। ছেলেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাছে একটা হারমোনিয়াম কিনে দেবার আবদার করে আসছিল। কিন্তু অভাব অনটনের কারণে তিনি গান শেখার জন্য ছেলেকে একটা হারমোনিয়াম কিনে দিতে পারেননি। গানের তালিম নেবার জন্য ছেলেকে কোন সংগীত গুরুর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থাও করতে পারেননি। তবুও ছেলে হায়দার হাল ছাড়েনি। নিজের প্রচেষ্টাতেই চর্চা চালিয়ে গিয়ে হায়দার দু-তিনটে বড় রিয়ালিটি শো’য়ে গানের অডিশন দিয়েছিল। কিন্তু উপযুক্ত তালিমের অভাবে ছেলেকে পিছিয়ে আসতে হয়েছিল। আনসার আলি জানান, তিনি না পারলেও তাঁর ছেলের হারমোনিয়ামের আবদার পূরণ করে দিলেন হাবড়ার অশোকনগর নিবাসী সংগীত প্রেমী রিয়া রুবি মহাশয়া। আনসার অলি জানালেন, রিয়া রুবি মহাশয়ার দেওয়া হারমোনিয়ামকে আঁকড়েই হয়তো আগামীদিন তাঁর ছেলে হায়দারের গায়ক হবার স্বপন পূরণ হবে।

সংগীতপ্রেমী রিয়া রুবি মঙ্গলবার জানান, একটা হারমোনিয়ামের জন্য গায়ক হবার স্বপ্নে বিভোর হায়দারের আকুতি তাঁকে ব্যাথিত করেছিল। তাই হায়দারের ইচ্ছা পূরণের জন্য নিজের জন্মদিনের অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়ে সেই অর্থে তিনি একটি নতুন হারমোনিয়াম কেনেন। এছাড়াও পূর্ব বর্ধমানের গলসি নিবাসী তার গুণমুগ্ধ আজিজুর রহমান ও লালন শেখ নতুন জামা কাপড় ও বেশ কিছু খাদ্যসামগ্রী হায়দারের পরিবারের জন্য কেনেন। সোমবার তাঁরাই নতুন হারমোনিয়াম সহ সব সামগ্রী হায়দারের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। রিয়াদেবী জানিয়েছেন, দৃষ্টিহীন কিশোর হায়দারের গায়ক হবার স্বপ্ন পূরণ হোক ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনাই তিনি জানাবেন।