নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি: ৪৫, ৫২ ও ৬৩। ক্রিকেট মাঠের বিচারে বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া তিন খেলোয়াড়কে নিয়ে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের প্রথম ডিভিশন ক্রিকেটের সুপার সিক্সের লক্ষ্যে সুভাষ স্পোর্টিং ক্লাব। ২ ম্যাচ খেলে তারা পেয়েছে ৬ পয়েন্ট। বাকি তিন ম্যাচের একটিতে জিতলেই সুপার সিক্সে চলে যাবে তারা। চমক এখানেই শেষ নয়, সুভাষ স্পোর্টিংয়ের ‘ড্যাডিজ আর্মি’র অন্যতম প্রতিনিধি মনোজ ভার্মা দুই ম্যাচ খেলে ইনসুইং বোলিংয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে ক্লাবের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। একটি উইকেট নিলেও নতুন বলে তাঁর ওপেনিং পার্টনার ৬৩ বছরের তপন ভাওয়াল নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে বিপক্ষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। অফস্পিন বোলিংয়ে ছাপ ফেলেছেন পঁয়তাল্লিশের সুদীপ চক্রবর্তী। তাঁকে অবশ্য শুধু বয়স নয়, ম্যানেজ করতে হচ্ছে পুলিশে আইসি-র পদে থাকার ব্যস্ততাকেও।

তিন ‘বুড়ো’র ক্রিকেট মাঠে প্রত্যাবর্তনের গল্প মোটামুটি একরকম। সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘ছোটবেলাতে ডানকুনিতে থাকার সময় টেনিস বলে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিলাম। পরে কলেজে পড়তে ধানবাদে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও খেলেছি। ২০০১ সালে নদিয়ায় চাকরি জীবন শুরু করি। তখন থেকেই ক্রিকেট কিট সঙ্গে নিয়ে ঘুরি। কিন্তু কখনই এক জায়গার কিট অন্য জায়গায় নিয়ে যাই না। কোনো প্রতিশ্রুতিমান ক্রিকেটারকে উপহার দিয়ে আসি। চাকরিতে আসার পর থেকে টেনিস বলের ক্রিকেটই বেশি খেলেছি। ভাবিনি এখানে এসে ক্লাব পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাব। একদিন কাঞ্চনজঙ্ঘা ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিতদের নিয়ে ক্রিকেট প্র‌্যাকটিসে এসেছিলাম। তখন মনোজ ভার্মা সেখানে ওয়ার্ম আপ করছিলেন। তিনি আমাকে বেশ কয়েকটা বল করার পর হঠাৎই ক্লাব ক্রিকেট খেলার প্রস্তাব দেন। আমিও রাজি হয়ে যাই। মাঠে ফেরার প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ’স্টেডিয়ামে এসে শিলিগুড়িতে মহিলা দলের সঙ্গে অনুশীলন করেছি। প্রস্তুতি সারতে গিয়েছি চম্পাসারি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতেও। এখনও পর্যন্ত ব্যাট হাতে রান করে উঠতে পারিনি। ফিটনেস লেভেলে উন্নতি করতে পারলে সেটাও এসে যাবে। খেলাটা উপভোগ করছি।’ সুদীপবাবুর কথায়, ‘আমাকে যদি ড্রেস করিয়ে মাঠের বাইরে ক্লাব বসিয়ে রাখে তাহলেও অখুশি হব না। আমার কাছে মাঠে যাওয়ার সুযোগ পাওয়াটাই আসল।’

তপন ভাওয়াল অবশ্য শিলিগুড়ি ময়দানের পরিচিত মুখ। ৪৪ বছর পর্যন্ত স্বস্তিকা যুবক সংঘের হয়ে খেলেছেন। তপনবাবু বলেন, ‘ক্রিকেট আমার রক্তে। মাঝে অফিসের চাপে খেলা থেকে সাময়িক বিরতি নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু অবসর নেওয়ার পর মাঠে ফেরা নিয়ে কোনো দ্বিধা ছিল না। দুই বছর ধরে সুভাষের হয়ে খেলছি। নিশ্চয় আগের থেকে শক্তিতে কিছুটা টান পড়েছে। কিন্তু নিয়মিত শরীরচর্চা করায় মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না।’ তপনবাবুর মতে, ‘ক্রিকেট মাঠে আমার প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্য একটাই, নিজে য়া শিখেছি, সেটা তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।’

ক্রিকেট উপভোগ করলেও মনোজ ভার্মার মনে একটা আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা যখন আগে খেলতাম তখন কিন্তু কোচিং ক্যাম্পের দলগুলি ভালো ফাইট দিত। খুব বেশি রান করতে না পারলেও পুরো ওভার খেলত। এবার দুটো ম্যাচ খেললাম। সেই লড়াইটা কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি না। গত বছর স্টেডিয়ামে ক্রিকেট লিগ দেখতে দেখতেই মনে হয়েছিল, শিলিগুড়িতে ক্রিকেটের মান পড়ে গিয়েছে। এবার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল। তাঁর বাইশ গজে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে জোড়া লক্ষ্য নিয়ে মনোজ বলেছেন, আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে শিলিগুড়ির ক্রিকেটের উন্নতিতে সাহায্য করতে চাই। আর অবশ্যই সুভাষ স্পোর্টিংকে সুপার সিক্সে নিয়ে যাওয়া। লক্ষ্যপূরণ করতে পারলে খুশি হব। একটু থেমে তিনি আরও যোগ করেন, ক্রিকেটে ব্যাট-বলের মতো মস্তিষ্কেরও লড়াই চলে। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, কখন কোন ব্যাটসম্যান কোন দিকে শট নেবে, ফিল্ডার কোথায় রাখলে কাজ হবে, ব্যাটিং অর্ডার কেমন হলে দল উপকৃত হবে, সবই আমাদের অধিনায়ক মহেশ তিওয়ারির সঙ্গে শেয়ার করি। তিন ‘বুড়ো’র অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন মহেশও। তিনি বলেন, ‘তিনজনই প্রচুর সিনিয়ার হলেও কখনও আমার ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়নি। স্বাধীনভাবে আমি নেতৃত্ব দিচ্ছি। কঠিন পরিস্থিতিতে ওঁদের পরামর্শ আমার সম্পদ। সবাই মিলে দলকে সুপার সিক্সে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।