করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলার তিন পড়ুয়া

562
ফাইল ছবি।

কলকাতা : কলকাতার কিছু পড়ুয়া বিপর্যয়ের সময় গরিব মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। এরা সবাই পড়াশোনাতেও তুখোড় এবং প্রধানত নিজেদের উদ্যোগেই তাঁদের এই প্রচেষ্টা। এঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে পাড়ার চায়ের দোকান, শপিং মল অথবা ক্যাফেতে দেখে মনে হতে পারে, এই করেই বোধহয় এঁদের জীবন কাটে। একদম ভুল ধারণা। বরং, বিপদের সময় মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ পায়। এই পড়ুয়ারাই ত্রাণ দিতে পুরুলিয়ার আদ্রায় কুষ্ঠরোগীদের কলোনিতে পৌঁছে গিয়েছে। সেই কলোনির পরিচয় মণিপুর বস্তি নামে। সেখানে তাঁরা প্রতিদিন দেড়শো মানুষকে রান্না করা খাবার দিচ্ছেন। ওই বস্তির অর্ধেক মানুষ ভিক্ষাজীবী, বাকিরা দিনমজুর। সচ্ছল পরিবারের মানুষেরও খোঁজ পাওয়া যাবে ওই বস্তিতে, যাদের কুষ্ঠ হওয়ার কারণে আত্মীয়রা ত্যাগ করেছেন। দূরদূরান্তের মানুষ এখানে বাস করেন। হয়তো সেরে উঠেছেন, কিন্তু কেউ কাজ দিতে চান না। অনেকে বাড়ি থেকে র‌্যাশন কার্ড এনে উঠতে পারেননি। কলকাতার পড়ুয়ারা এতসব কিছু না জেনেই সেখানে ত্রাণ দিতে গিয়েছেন। যাওয়ার পর মানুষের দুর্দশার কথা কানে এসেছে। এই বিপর্যয়ে সময় এক-একজন এক-একরকমভাবে মানুষকে আলো দেখানোর চেষ্টা করছেন। যেমন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন পড়ুয়া এমন একটি ইনটেলিজেন্ট ডিভাইস তৈরি করে ফেলেছেন, যার সাহায্যে কেউ কোভিড ১৯-এর বাহক কিনা ধরে ফেলা যাবে। অর্থাত্ আপনার পাশে যদি কেউ অনবরত কেশে চলে, তাহলে এই যন্ত্র বলে দেবে, তিনি কোভিড ১৯-এর বাহক কিনা।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত এক অধ্যাপক বলেছেন, ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের স্নাতকস্তরের দুই পড়ুয়া অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আঁচল নিলহানি এই যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। কোভিড ১৯-এর বাহক চিহ্নিত করতে এই যন্ত্রটিকে প্রথম স্তরের স্ক্রিনিংয়ে ব্যবহার করা সম্ভব। যদি একবার বাহককে চিহ্নিত করে ফেলা যায় তাহলে করোনার সংক্রমণও রোধ করা সম্ভব। কোয়ারান্টিন সেন্টার, অফিস, ক্লাসরুম অথবা যে কোনও জমায়েতে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তৃতীয় বর্ষের এই দুই পড়ুয়াকে গাইড করেছেন অধ্যাপক পি ভেঙ্কটেশ্বরন। আইসিএমআর এবং যেসব চিকিত্সক করোনা সংক্রামিত রোগীদের চিকিৎসা করছেন তাঁরা এই যন্ত্রের ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছেন। শীঘ্রই ক্লিনিক্যাল টেস্টিং-এর (রিয়াল টাইম) জন্য পাঠানো হবে এই যন্ত্র। সংক্রমণ আছে কিনা তা জানতে এই যন্ত্র কারও শরীরে স্পর্শ করানোর প্রয়োজন হবে না। উন্নতমানের সেন্সর কাশির শব্দ শুনে অথবা উপসর্গের ধরন দেখে সংক্রমণ সংক্রান্ত তথ্য দেবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসু বলেছেন, লকডাউনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও গবেষণা থেমে নেই। ছাত্রছাত্রীরা যেমন গবেষণা চালিয়ে য়াচ্ছেন, তেমনই দুঃস্থদের পাশেও দাঁড়াচ্ছেন।

- Advertisement -

পূর্ব বর্ধমানের মেমারির এক স্কুলের এগারো ক্লাসের ছাত্রী দিগন্তিকা বোসও এমন একটি মাস্ক তৈরি করে ফেলেছে যা করোনা সংক্রামিত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতার জন্য দিগন্তিকার মাস্কের ডিজাইন বাছাই করা হয়েছে। মেমারির বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দির (ব্রাঞ্চ ২)-এর ছাত্রী দিগন্তিকার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইংরেজিতে এই মাস্কটিকে বলা হচ্ছে, এয়ার প্রোভাইডিং অ্যান্ড ভাইরাস ডেসট্রয়িং মাস্ক। এই মাস্কটি ডিজাইন করতে সাতদিন সময় লেগেছে দিগন্তিকার। বেশ কয়েক দফা পরীক্ষানিরীক্ষার পর কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রক করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই মাস্কটি ব্যবহারের জন্য দিগন্তিকার অনুমতি চেয়েছে। এমন বিপর্যয়ের মুহূর্তে আরও অনেক ভালো কাজের মধ্যে দিগন্তিকার এই ভূমিকাও উজ্জ্বল নজির হয়ে থাকবে।