লকডাউনে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে দিশা দেখাচ্ছেন রায়গঞ্জের ৩ যুবক

374

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: করোনা সংক্রমণ রোধে লকডাউনের ওপরেই ভরসা করেছিল সরকার। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে লকডাউন চলার ফলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রবল আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের কাজে আসতে বারণও করেছে। এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন রায়গঞ্জের বরুয়া পঞ্চায়েতের তিন যুবক বিশ্বজিৎ দেবনাথ, অভিজিৎ দেবনাথ ও নীতীশ দেবনাথ। তারা কোচবিহারের একটি আলমারি ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। লকডাউনের শুরুর দিকেই তারা কাজ হারান। বাড়িতে ফিরে ওই তিন যুবক দু’মাস বসেই ছিলেন। কিন্তু তারা হতাশ হননি। নাছোড় মনোভাব নিয়ে তারা বিকল্প আয়ের সন্ধান চালিয়েছেন। আয়ের দিশা পেতে ওই তিন যুবক স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের পরামর্শে তাঁরা বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছের চাষ শুরু করেছেন।

দলের সদস্য অভিজিৎবাবু জানান, এখন বাজারে মাছের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। নদীর জল হুহু করে বাড়ার ফলে নদীয়ালি মাছও জালে উঠছে না। এই পরিস্থিতিতে মৎস্যবসায়ীরা বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চাষ করা মাছের জোগানের ওপরে কিছুটা ভরসা করছেন। আমরা জানতে পারি এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতে গিয়ে বেশি খরচ হয় না। তাই আর বেশি ভাবিনি। এ বিষয়ে জানার পরেই আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে আলমারি ফ্যাক্টরিতে আর কাজ করব না। বরং নিজেরাই ব্যবসা করব। নিজেরাই স্বনির্ভর হব। এরপর আমরা নিজেদের জমানো কিছু টাকা ও কিছুটা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি।

- Advertisement -

তবে এই তিন যুবক মাছ চাষের ওপরেই কেবল ভরসা করেননি। তাঁরা ইতিমধ্যে বাড়িতে মুড়ির মেশিনও বসিয়েছেন। লকডাউনের মধ্যে মুড়ির চাহিদা বাড়ায় তারা মেশিন বসানোর জন্য প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচও করেছেন। প্রতিদিন মেশিনের মাধ্যমে। ২ কুইন্টাল মুড়ি উৎপাদিত হচ্ছে।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ সম্পর্কে নীতীশবাবু বলেন , এই পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য দুটি ট্যাংক বানাতে হয়েছে। একেকটি ট্যাংকের আয়তন ১৬৯ ঘনফুট। প্রতিটি ট্যাংকে দশ হাজার লিটার জল ধরে। এরজন্য একটি জলের মেশিন কিনতে হয়েছে। আর কিনেছি মাছের পোনা। এরজন্য মোটামুটি ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি খরচ পড়েছে। একেকটি ট্যাংক থেকে ৫-৬ কুইন্টাল পর্যন্ত মাছ পাওয়া যায়। আমরা এই পদ্ধতিতে পাবদা, কইয়ের মতো মাছগুলি চাষ করছি। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চাষ করতে গেলে তিন মাস সময় প্রয়োজন। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে এই চাষ চলছে। ট্যাংকের জলে অ্যামোনিয়া ও লবণের সঠিক পরিমাণ থাকলেও তিনবার খাবার দেওয়া হলে মাছ খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়। ফলে বাজারদর বেড়ে যায়।

অভিজিৎ জানান, আপাতত দুটি ট্যাংকে চাষ চলছে। শীঘ্রই আরেকটি নতুন ট্যাংক বসাব। তিনরকম মাছ চাষ করা হবে। তবে আমাদের এই কাজে মৎস্য দপ্তর কোনও সাহায্য করেনি। বরং আমরা ঋণ পাব না বলেই আমাদেরকে মৎস্য দপ্তর জানিয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা পিন্টু সরকার বলেন, নিজেদের ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় মনের জোর থাকলে অভাব যে বাধা হতে পারে না, তা অভিজিৎ, বিশ্বজিৎ ও নীতীশ প্রমাণ করে দেখিয়েছে। সরকারি সাহায্যের আশায় বসে না থেকে ওরা যে আজ স্বনির্ভর হয়েছে তা কেবল ওদের মনের জোরে। বরুয়ার প্রধান ধনেশ্বর বর্মন বলেন, পঞ্চায়েত আগামীদিনে ওই তিন যুবকের পাশে থাকবে।