একুশের মহারণে ফুল ফোটাতে মগজাস্ত্রে টক্কর

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : লড়াইটা যতটা মাঠে-ময়দানে ততটাই অঙ্ক কষার। তাই দুপক্ষের দুই থিংকট্যাংক রণকৌশল ঠিক করে দিচ্ছেন প্রতি পর্যায়ে একদিকে অমিত শা-জেপি নাড্ডা জুটি আর তার মোকাবিলায় ভোটকৌশলী প্রশান্ত কিশোর ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি। ফাইনাল হবে ২০২১-এ। তাতেই ঠিক হবে বাংলায় পদ্ম ফুটবে নাকি ঘাসফুল মেলা রয়ে যাবে।

আগামী বিধানসভা ভোটে বাংলা দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি। তাতে সায় দিয়েছে আরএসএস-ও। তাই খানিকটা শিথিলতা দেখিয়ে মুকুল রায়কে সর্বভারতীয় সহ সভাপতি পদে বসাতে আপত্তি তোলেনি সংঘ পরিবার। সূত্রের খবর, বাংলা দখলে পার্টির অভ্যন্তরে মিশন-২০০ ঘোষণা করেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আর সেই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শার ফর্মুলা-২৩ পরিকল্পনা অনুয়ায়ী পা ফেলছে বঙ্গ বিজেপি। ফর্মুলা-২৩এ বুথস্তরের সংগঠনের উপরই সবথেকে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতাদের দাবি, বাস্তবে দল কতটা শক্তিশালী সেটা বুথস্তরের শক্তি দেখলেই স্পষ্ট হয়। বুথে সংগঠন বাড়িয়ে কীভাবে রাজ্যে ক্ষমতায় আসবে দল সেটাই বলা হয়েছে অমিত শার ফর্মুলায়। অন্যদিকে, নবান্ন ধরে রাখতে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছে তৃণমূল। পিকের পরামর্শেই ফর্মুলা-২৩এর বিকল্প হিসাবে বাংলার গর্ব মমতা কর্মসূচিকে ঢাল করে বুথস্তরে মাঠে নেমেছে তৃণমূল। কাগজে-কলমে ৭৫ দিনের বাংলার গর্ব মমতা কর্মসূচি শেষ হয়েছে মে মাসেই। তবে করোনার কারণে সেই কর্মসূচি সম্পূর্ণ করতে পারেনি তৃণমূল। তাই ফর্মুলা-২৩এর জবাব দিতে মমতার নামে কর্মসূচিই এখন তৃণমূলের প্রধান অস্ত্র।

- Advertisement -

বিজেপি সূত্রের খবর, অমিত শার ফর্মুলা অনুসারে সাংগঠনিকভাবে মণ্ডলস্তর থেকে বুথগুলিকে এ, বি, সি এবং ডি এই চার ক্যাটিগোরিতে ভাগ করা হয়েছে। যে বুথগুলিতে বিজেপি সাংগঠনিক দিক থেকে এক নম্বরে সেই বুথগুলিকে এ ক্যাটিগোরির বুথ বলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তার থেকে কম শক্তিশালী বুথগুলিকে বি, সি এবং ডি ক্যাটিগোরির বুথ হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পার্টির সাধারণ কর্মীরা সবথেকে বেশি ডি ক্যাটিগোরির বুথে নজর দেবেন। পার্টির অফিস পরিচালনার দায়িত্বে যাঁরা থাকবেন তাঁরা সি এবং বি ক্যাটিগোরির বুথের জন্য কাজ করবেন। এ ক্যাটিগোরির বুথগুলিকে মডেল হিসাবে তুলে ধরে সেগুলি সরাসরি দলের জেলা কমিটির তত্ত্বাবধানে চলবে। দলের রাজ্য সদর দপ্তর থেকে বুথের কর্মীদের ফোন নম্বর নিয়মিত আপডেট করতে হবে। প্রতিদিনের দলীয় কর্মসূচির প্রচার সহ বিভিন্ন কাজের জন্য প্রতি বুথে কমপক্ষে তিনজন অ্যাক্টিভ মেম্বার রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুথে সপ্তাহে অন্তত ছয়টি দলীয় কর্মসূচি পালন করার কথাও বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মন কি বাত-এর প্রতিটি আলোচনা শোনার জন্য বুথে যথায়থ বন্দোবস্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বুথ সদস্যকে নমো অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়েছে। স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে নিয়মিত সদস্য সংগ্রহ অভিয়ান চালু রাখা এবং ভার্চুয়াল প্রচার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বুথের যত বেশি সংখ্যক ভোটারকে সচেতন করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

ফর্মুলা-২৩এ বুথের নেতাদের নিয়মিত সমস্ত শাখা সংগঠন, জেলা ও রাজ্য নেতৃত্ব এবং আরএসএস-এর সমস্ত সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলেছেন অমিত শা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলাকার সমস্ত এনজিও, সেল্ফ-হেল্প গ্রুপ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাদা করে যোগাযোগ করার নির্দেশও দিয়েছেন। একটি বুথের কমপক্ষে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাতে বিজেপির পতাকা ও প্রতীক পদ্মফুল খুব ভালো করে দেখা যায় তার বন্দোবস্ত করতেও বলা হয়েছে। বুথ কমিটি তৈরির ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নিয়ম বলে দেওয়া হয়েছে ফর্মূলা-২৩এ। বুথের অবস্থান অনুসারে প্রতিটি এলাকার প্রতিনিধি যাতে কমিটিতে থাকেন সেটা সুনিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এলাকার সামাজিক বা সম্প্রদায়গত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সমস্ত ক্ষেত্রের প্রতিনিধিকে কমিটিতে সুযোগ করে দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, ফর্মুলা-২৩ মেনে যাতে কাজ হয় তার জন্য দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা পশ্চিমবঙ্গের পাঁচ জোনের দশজন প্রবাসী কার্যকর্তাকে নির্দেশ পাঠিয়েছেন। রাজ্য দখলে বিজেপির একঝাঁক প্রথম সারির কেন্দ্রীয় নেতা ডিসেম্বর থেকেই রাজ্যে ঘাঁটি গাড়বেন বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের খবর, ২০২১-এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাজ্যে আসবেন অমিত শা। টানা আটদিন থাকবেন তিনি। সেই সময় দলের সাংগঠনিক পাঁচটি জোনেই যাবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, রাজ্যের প্রতিটি বুথেই আমাদের কমিটি তৈরি হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত কাজের মূল্যায়ন করে তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন এখন সময়ে অপেক্ষামাত্র। রাজ্যে প্রায় ৭৯ হাজার বুথ আছে। বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক রথীন্দ্রনাথ বসু জানিয়েছেন, তাঁরা এখন পর্যন্ত রাজ্যে ৯৮ লক্ষ প্রাথমিক সদস্যপদ সংগ্রহ করেছেন। সেই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

অবশ্য তৃণমূল নেতা তথা পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের দাবি, তাঁদের সদস্য সংখ্যার ধারেকাছেও এখনও পৌঁছাতে পারেনি বিজেপি। আর বাংলার গর্ব মমতা কর্মসূচি চালুর পর প্রতিদিনই বিজেপি ভেঙে তৃণমূলে আসছেন নেতা-কর্মীরা। তৃণমূল কর্মী সম্মেলন, জলযোগ-যোগাযোগ, স্বীকৃতি সম্মেলন, বঙ্গধ্বনি যাত্রা, সংহতি সভা, চেতনা সভা, বাংলার বার্তা, নবীনবরণ সভা, বিশিষ্ট সম্মেলন, তৃণমূলের সঙ্গে মান্যজন এবং তৃণমূল পদাতিক সম্মেলন- বাংলার গর্ব মমতায় মোট এই ১১টি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রাজ্য তৃণমূল সূত্রের খবর, প্রতিটি কর্মসূচিকেই বুথভিত্তিক কর্মসূচি হিসাবে পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে ইতিমধ্যেই পাঁচ লক্ষেরও বেশি বুথস্তরের সক্রিয় কর্মী তৈরি করা হয়েছে বলেই দাবি করেছেন রাজ্য তৃণমূলের নেতারা। যাতে সফলতার সঙ্গে বুথস্তরে বঙ্গধ্বনি যাত্রা ও তৃণমূল পদাতিক সম্মেলন করা যায় তা সুনিশ্চিত করতে তৃণমূল ভবন থেকে জেলা নেতাদের বার্তা পাঠানো হয়েছে। বুথে বুথে পদয়াত্রা করা, এলাকার বিশিষ্টদের নিয়ে আলোচনায় বসা, তাঁদের পরামর্শ শোনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সেইমতো বিধানসভাভিত্তিক কাজও শুরু হয়েছে।

বাংলার গর্ব মমতা কর্মসূচিকে এবার বুথভিত্তিক কর্মসূচির রূপ দিতে চলেছে তৃণমূল। প্রতিটি বুথেই কমপক্ষে ১০ জন সক্রিয় সদস্য তৈরি করা হয়ে গিয়েছে। বুথভিত্তিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আগেই তৈরি হয়েছিল। সেই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে গ্রুপকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে। ফিরহাদ হাকিম বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুকরণ করে অমিত শা যতই ফর্মুলা তৈরি করুন, তা কাজে লাগবে না। বাংলার প্রতিটি বুথই আমাদের শক্ত ঘাঁটি। সেই ঘাঁটি আরও শক্তিশালী করতে মুখ্যমন্ত্রীর ছবিকে সামনে রেখেই আমরা মাঠে নেমেছি। তবে, মুখে না বললেও বিজেপি যে কড়া টক্কর দেবে, তা আড়ালে-আবডালে মানছেন তৃণমূলের ভোট ম্যানেজাররা। সেইজন্যই তৃণমূলের ডিজিটাল মিডিয়ায় নতুন সংযোজন মার্ক ইওরসেল্ফ সেফ ফ্রম বিজেপি। বিজেপি থেকে বাঁচার যে দাওয়াই তৃণমূলের ভোটকৌশলীরা দিচ্ছেন তা সত্যিই অভিনব। কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রশ্নমালার জবাব দিলেই কট্টর বিজেপি-বিরোধীদের চিনে নিচ্ছেন তৃণমূলের থিংকট্যাংকরা। তাঁদের সেইমতো কাজে লাগানোর পরিকল্পনা চলছে। ভোটের ময়দানে ফুল ফোটাতে দুপক্ষের বুদ্ধির লড়াই এখন রাজ্যে সেরা আকর্ষণ।