ফালাকাটায় গা বাঁচাচ্ছেন ভোট ম্যানেজাররা

সুভাষ বর্মন : ফালাকাটা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি দুই শিবিরেই নেতাদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। আর তা হল ব্যর্থতার আতঙ্ক। দুদলের স্থানীয় নেতারা জানেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে যদি ফালাকাটায় উপনির্বাচন হয়, তাহলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দেখবেন সেটা ভোটের স্টেজ রিহার্সাল হিসাবেই। আর সেখানে দলকে ডোবালে সেটা শীর্ষ নেতৃত্ব ভালো চোখে নেবেন না।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সঠিক সময় উপনির্বাচন না হওয়ায় প্রায় ১০ মাস ধরে বিধায়কহীন অবস্থায় রয়েছে ফালাকাটা। আগামী নভেম্বরের মধ্যে উপনির্বাচন করে ফেলতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলে সব দলের কাছে সময় রয়েছে মাত্র দুমাস। কিন্তু বিধায়ক পদপ্রার্থী হিসেবে তৃণমূল বা বিজেপি কেউই এখনও কাউকে খুঁজে পায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীদের আলোচনায় একটা কথা স্পষ্ট-  বিধায়ক অনিল অধিকারীর প্রয়াণে ফালাকাটায় তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত জমি দুর্বল হয়ে পড়েছে। দলে অনিলের বিকল্প মুখ নেই। তাই ফালাকাটায় এককভাবে দলের রাশ এখন কারও হাতে নেই। তৃণমূল কংগ্রেস এখনও এখানে কাউকে প্রোজেক্ট করেনি। এই আসন দখলে মরিয়া বিজেপিও। কিন্তু পদ্মশিবিরেও একই পরিস্থিতি। সবাই যেন গা বাঁচিয়ে চলছেন। দলকে জেতানোর থেকে ব্যর্থতার দায় যেন ঘাড়ে না আসে তা নিশ্চিত করতেই নেতারা ব্যস্ত। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি দুই দলই একাধিক নেতাকে এই আসনের দায়িত্ব দিয়েছে। দুদলের স্থানীয় কর্মীরাই বলেছিলেন, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট না হয়। কিন্তু এখন তো দায়িত্ব পেয়ে কোনও দলের কোনও নেতাকে ফালাকাটায় মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না।

- Advertisement -

কয়েক মাস আগেও করোনা পরিস্থিতির জেরে কোনও দলই চায়নি যে এখানে উপনির্বাচন হোক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ভোটের ঢাক বাজাতেই সব রাজনৈতিক দল নড়েচড়ে বসেছে। তবে ফালাকাটা নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপি দুপক্ষই ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে চলেছে। কখনও কৃষক সংগঠনের নেতারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফসলের কী হাল খোঁজ নিয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন। কখনও আইপ্যাকের টিম এলাকায় ঘুরে কার কী ক্ষোভ জানতে চেয়েছে। আবার কখনও বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এসে বৈঠক করেছেন। কিন্তু ফালাকাটায় তৃণমূলের মুখ কে? বিজেপির মুখই বা কে? তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, অনিল অধিকারীর পর এখানে প্রার্থী বা দলের মুখ হিসেবে কাউকে তুলে ধরে প্রচার করার সাহস কোনও দলই পাচ্ছে না। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝেছেন, ফালাকাটায় অনিলবাবুর বিকল্প কেউ নেই। কিন্তু ২০১১ থেকে জিতে আসা এই আসন বিধানসভা ভোটের আগে তিনি কোনওভাবেই হাতছাড়া করতে চাইছেন না। সেজন্য অনিলবাবুর মৃত্যুর পরই ফালাকাটার জন্য তিনি বিশেষ দায়িত্ব দেন বনমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

ফালাকাটা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রাজীব বুঝে গিয়েছেন, এখানে ঠিকাদার নেতা, নেতৃত্বের ঝিমিয়ে থাকা, পঞ্চায়েতস্তরের জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি তৃণমূলকে পিছিয়ে দিয়েছে। এজন্য তিনি বারবার ফালাকাটায় এসে দলের ভিতরে ঝড় তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু তাতে আর কাজ কতটা হচ্ছে? দল কিন্তু এখনও কোনও নেতার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করেনি। দায়িত্বে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় থাকলেও ফালাকাটায় দলের দৈনন্দিন কাজকর্মের দেখভালের জন্য জেলাস্তরের বহু নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে দায়িত্ব পেয়েছিলেন আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী। আদিবাসী ভোটব্যাংকের কথা মাথায় রেখে দশরথ তিরকি, জেমস কুজুরকেও ফালাকাটার কিছু আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আবার দলের জেলা সভাপতি হিসাবে মৃদুল গোস্বামীকেও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ফালাকাটাকে দেখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের কাউকে ফালাকাটায় মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি আলিপুরদুয়ার জেলার দায়িত্ব পেয়ে ফালাকাটায় খুব বেশি সময় দেননি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মাদারিহাটে বসে থাকলেও ফালাকাটাকে যেন কিছুটা এড়িয়ে চলছেন।

বিজেপির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। দলের জেলা সভাপতি গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা এখন আর ফালাকাটায় ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থাকছেন না। বরং বিজেপিও একাধিক নেতাকে একাধিক দায়িত্ব দিচ্ছে। ১৩টি অঞ্চলে ১৩ জন নির্বাচনি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। দলের মণ্ডল ও জেলাস্তরের নেতাদেরও নানা দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয় সারিতে থাকা সিপিএমেরও প্রস্তুতি চলছে। তবে বাম দলের মুখ কে, জানা যাচ্ছে না। তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী বলেন, দল প্রার্থী ঠিক করে। তাই দল যাকে প্রার্থী করবে, আমরা তাঁর জন্য লড়াই করব। সময় হলেই দল তা ঘোষণা করবে। বিজেপির জেলা সভাপতি গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা বলেন, আমাদের দলের প্রার্থী হল পদ্মফুল। মানুষ পদ্ম প্রতীক দেখে ভোট দেবেন। ঠিক সময়ে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক মৃণালকান্তি রায় বলেন, আমাদের দলের প্রার্থী ঠিক করা রয়েছে। ভোট ঘোষণা হলে আমরাও প্রার্থী ঘোষণা করব।