কোচবিহারে জোড়া অঙ্ক কষছেন তৃণমূল জেলা সভাপতি

1469

গৌরহর দাস, কোচবিহার: কাকা বিনে গতি নেই ভাইপোর। ইদানীং কোচবিহার জেলা তৃণমূলের  অন্দরমহলে কান পাতলে এই একটাই সুর শোনা যাচ্ছে। দলের নীচুতলার কর্মী থেকে শুরু করে নেতারাও বলাবলি করছেন, পার্থপ্রতিম রায়কে যতই তৃণমূলের জেলা সভাপতি করা হোক না কেন, তাঁর পক্ষে ২০২১ সালের নির্বাচনি বৈতরণি পার করা উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী তথা তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষের আশীর্বাদ ছাড়া কার্যত অসম্ভব। কোচবিহারে তণমূলের রাজনৈতিক অঙ্ক অন্তত এমনটাই বলছে। ফলে জেলা সভাপতি হওয়ার পর পার্থ যতই ছোটাছুটি করুন বা রাজনৈতিক সভা করে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার চেষ্টা করুন না কেন, রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে কাকার শরণাপন্ন তাঁকে হতেই হবে। তবে, বর্তমানে কাকা-ভাইপোর যা সম্পর্ক তাতে কাকাকে ম্যানেজ করা ভাইপোর পক্ষে আদৌ সম্ভব কি না, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। তণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, গোটা জেলা নিজের মুঠোয় আনতে পার্থপ্রতিম রায় নিজস্ব টিম তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু তার জন্য সময় লাগবে। তার আগে বিধানসভা নির্বাচন উৎরোতে তাঁকে রবি ঘোষের কাছে যেতেই হবে।

নির্বাচনে ভালো ফল করতে যে কাকার সহযোগিতা প্রয়োজন, সে কথা মানছেন ভাইপো পার্থপ্রতিম রায় নিজেও। তিনি বলছিলেন, কাকার এতদিনের অভিজ্ঞতা, দলের সিনিয়ার লিডার। তাছাড়া উনি দলে প্রথম দিন থেকে রয়েছেন। ওঁর পরামর্শ, সহযোগিতা তো একশো শতাংশ দরকার। ওঁকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বিধানসভা নির্বাচন জয় করব। রবিবাবু নিজে অবশ্য ধরাবাঁধা লাইনেই বলছেন, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে যেভাবে দলের কাজ করতে বলবেন আমি সেভাবেই কাজ করব। তবে কোচবিহারে তণমূলের ভিতরের খবর যাঁরা জানেন, তাঁদের মতে, এই পাখি-পড়া বুলির বাইরেও অনেক যদি, কিন্তু থেকে যায়, যা রবিবাবু প্রকাশ্যে বলেন না। মন্ত্রী হলেও রবীন্দ্রনাথ ঘোষ জেলায় দলের কোনও পদে নেই। তবু আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহারে জয়ের জন্য দলের তাঁকে বড় প্রয়োজন। জেলার নয়টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটিতেই রবি ঘোষের প্রভাব রয়েছে, যেটা দলের অন্য কোনও নেতার নেই। রবি ঘোষ নিজে নাটাবাড়ির বিধায়ক। সিতাই ও শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক জগদীশ বর্মাবসুনিয়া ও হিতেন বর্মন তাঁর অনুগামী হিসাবেই পরিচিত।

- Advertisement -

মাথাভাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক বিনয়কৃষ্ণ বর্মনকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় জেলা সভাপতি করা হয়েছে পার্থকে। পদ হারিয়ে বিনয়বাবুর মনে যে ক্ষোভ জমেছে, তা স্বাভাবিক। পাশাপাশি, মাথাভাঙ্গার মোজাফফর রহমান তৃণমূলের সংখ্যালঘু সেলের জেলা সভাপতি পদে রয়েছেন। তিনি রবি ঘোষের কাছের লোক হিসাবেই পরিচিত। মাথাভাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রের নিশিগঞ্জ-২, প্রেমেরডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েত সহ বিস্তীর্ণ অংশে সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় পুরোটাই মোজাফফরের নিয়ন্ত্রণে। মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি মজিরুল হোসেনও কার্যত রবিবাবুর নির্দেশে চলেন। মাথাভাঙ্গা পুর সভার প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান চন্দন দাস ও তৃণমূল নেত্রী কল্যাণী পোদ্দার পুরোপুরি রবি অনুগামী। তুফানগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের তুফানগঞ্জ-২ ব্লক ছাড়া তুফানগঞ্জ-১ ব্লকের চারটি গ্রাম পঞ্চায়ে ও তুফানগঞ্জ পুরসভা পড়ে। তুফানগঞ্জ-১ ব্লকের প্রাক্তন তৃণমূল সভাপতি জগদীশ বর্মন রবি ঘোষের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

তুফানগঞ্জ পুরসভার প্রাক্তন শহর মণ্ডল সভাপতি চানমোহন সাহা ও পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান অনন্তকুমার বর্মা দুজনেই নাটাবাড়ির বিধায়কের কাছের লোক। এছাড়া তুফানগঞ্জের নাককাটিগাছের নেতা পিন্টু হোসেন, বালাভূতের নেতা আখতার আলি মিয়াঁরাও রবিবাবুর অত্যন্ত স্নেহভাজন। কোচবিহার-২ ব্লক নিয়ে কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র। এখানে তৃণমূলের বিধায়ক না থাকলেও ব্লকের প্রাক্তন সভাপতি তথা গতবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী পরিমল বর্মন রয়েছেন। ব্লকে দল কার্যত তাঁর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। পরিমল বর্মনকে দলের নেতারা রবি ঘোষের অন্ধ অনুগামী বলেন। কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রটি কোচবিহার-১ ব্লকের নয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত ও কোচবিহার পুরসভা নিয়ে গঠিত।

গত লোকসভা নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে, এখানে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি থেকে তৃণমূল ২২-২৩ হাজার ভোটে লিড পেলেও শহরে এসে বিপুল ভোটে পিছিয়ে পড়ায় আসনটি খোয়াতে হয়েছে। তাই এবার শহরের ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোচবিহার শহরের ভোটের ক্ষেত্রে প্রয়াত চেয়ারম্যান বীরেন কুন্ডুর পরিবারের বড় প্রভাব এখনও রয়েছে। এই কুন্ডু পরিবারও রবিবাবুর অনগামী হিসাবেই পরিচিত। এছাড়া কোচবিহার শহরের ভোটের কিছটুা অংশ হিপ্পির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বতর্মানে হিপ্পি ও রবি ঘোষের মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে বলেই খবর। এর বাইরে পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান ভূষণ সিংয়ের প্রভাব কিছুটা আছে। কিন্তু তিনিও পুরোপুরো পার্থবাবুর নিয়ন্ত্রণে নেই। মেখলিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে গত লোকসভা নির্বাচনে দলের প্রার্থী তথা প্রাক্তন ব্লক ও শহর মণ্ডল সভাপতি পরেশ অধিকারী রবিবাবুর হাত ধরেই তৃণমূলে এসেছেন। মেখলিগঞ্জের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি লক্ষ্মীকান্ত সরকারও রবির অনুগামী হিসাবে পরিচিত।

দিনহাটা-২ ব্লকের প্রাক্তন সভাপতি মীর হুমায়ুন কবীরও রবিরই অনুগামী। সুতরাং, রবি ঘোষকে বাদ দিয়ে ভোট করতে গেলে জেলার নয়টি বিধানসভা এলাকাতেই পার্থকে নিজের বিশ্বস্ত লোক বসাতে হবে। যা এত কম সময়ে কার্যত অসম্ভব। এই সরল সত্য বুঝে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ব্লকে ব্লকে ঘুরে সংগঠন মজবুত করার লক্ষ্যে নামলেও নিজের পায়ের তলার জমি শক্ত করতে পারেননি। ২০২১-এর নির্বাচনের আগে সেই সময়ও তিনি পাবেন না। ফলে ভোট বৈতরণি পার হতে কাকার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। জেলা সভাপতি হওয়ার পর তিনি খোলাখুলি জানিয়েছিলেন, কাকার আশীর্বাদ নিতে তাঁর বাড়িতে অবশ্যই যাবেন। কবে তিনি সেই আশীর্বাদ চাইতে যান এবং রবি ঘোষ মান-অভিমান ভুলে কতটা সহযোগিতার হাত বাড়ান, সেটার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে কোচবিহার জেলায় তৃণমূলের ফলাফল।