ভরসা জনজাতিতে, তৃণমূলের খসড়া ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতির বান

179

দীপ্তিমান মুখোপাধ্যায়, কলকাতা : বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ‘মিশন উত্তরবঙ্গ’র ছাপ দলীয় ইস্তাহারে। এখনও প্রকাশ করা না হলেও তৃণমূল সূত্রে খবর, ইস্তাহার মোটামুটি তৈরি। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিলমোহরও পড়ে গিয়েছে ইস্তাহারের খসড়ায়। শুধু কিছু সংযোজন বাকি। দলের অভ্যন্তরের খবর, উত্তরবঙ্গের মতোই ইস্তাহারে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে জঙ্গলমহল ও কলকাতা লাগোয়া সেইসব জেলা, যেখানে গত লোকসভা নির্বাচনে জোর ধাক্কা খেয়েছিল তৃণমূল। উত্তরবঙ্গকে টার্গেট করেছে বিজেপিও। তোর্ষা থেকে গঙ্গার মাঝে বিস্তীর্ণ ভূভাগে ৫৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৪৫টি দখল করতে না পারলে রাজ্যে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে বলে মনে করেন বিজেপি নেতৃত্ব। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে বিজেপি উত্তরবঙ্গে এগিয়ে আছে ৩৮টি আসনে। তৃণমূল আবার হিসেব করেছে, উত্তরবঙ্গে ৩০টি আসন পেলেই ক্ষমতায় ফিরে আসা নিশ্চিত। ৩০টি আসন দখল করতে তৃণমূলের নজর যে বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর দিকে, তা ইস্তাহারের পরতে পরতে স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রাজবংশী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলিকে। বিজেপিরও নজর এই দুই গোষ্ঠীর দিকে। রাজবংশী ভোট নিশ্চিত করতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অনন্ত রায়ের সঙ্গে বৈঠক করে গিয়েছেন। অনন্ত অনুগামীরাই অমিতের কোচবিহারের সভা ভরিয়েছেন।

রাজবংশী এই ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে তৃণমূলের ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতিতে ভরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। অন্যান্যবারের মতো এবার তৃণমূল কোনও ইস্তাহার কমিটি গড়েনি। আগাম ঢাকঢোল না পিটিয়ে তৃণমূলের বাছাই করা কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিঃশব্দে দলীয় ইস্তাহার তৈরি করে ফেলেছেন বলে জানা গিয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শ ছিল বলে তৃণমূল সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই সূত্রে খবর, নির্বাচনের দিন ঘোষণার পরপরই ইস্তাহার প্রকাশের পরিকল্পনা আছে তৃণমূল নেতৃত্বের। রাজবংশী, কামতাপুরি, আদিবাসী, নমশূদ্রদের জন্য গত ১০ বছরে নানা প্রকল্প নিয়েছে তৃণমূল সরকার। পৃথক পৃথক উন্নয়ন পর্ষদ গঠিত হয়েছে এই জনগোষ্ঠীগুলির জন্য। তা সত্ত্বেও লোকসভা ভোটে বিশেষ করে রাজবংশী ও আদিবাসীরা মুখ ফিরিয়েছিলেন তৃণমূলের থেকে। রাজবংশী ও কামতাপুরি ভোটের পুরোটা তৃণমূলের পক্ষে ফিরবে, এমন নিশ্চয়তা প্রশান্ত কিশোরের টিম এখনও দলনেত্রীকে দিতে পারেনি। নির্বাচনি ইস্তাহারে তাই আরও বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীগুলির উন্নয়নে। তৃণমূল সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, নির্বাচনি ইস্তাহারে রাজবংশী ও নমশূদ্রদের জন্য দলীয় নেতৃত্ব তুরুপের তাস করতে চাইছেন সকলের মাথার ওপর ছাদের বন্দোবস্তের আশ্বাসকে। এজন্য রাজবংশী আবাস যোজনা ও নমশূদ্র আবাস যোজনা নামে দুটি পৃথক সরকারি প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি থাকবে ইস্তাহারে। এতে ওই দুই সম্প্রদায়ের সব পরিবারকে ঘর দেওয়ার কথা বলা হবে। এছাড়া মূলত ওরাওঁ, মুন্ডা, খড়িয়া, লোহার, মহালি, বড়াইক ইত্যাদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির মন জয়ের চা বাগানেও সকলের জন্য বাড়ি করে দেওয়ার আশ্বাস থাকবে। চা বাগানে বসবাসকারী শ্রমিক, অশ্রমিক- সবাই এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন।রাজবংশী সমাজসংস্কারক পঞ্চানন বর্মার নামের সঙ্গে রাজবংশী জনগোষ্ঠীর আবেগ জড়িত। এজন্য ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাজ্য সরকার কয়েক বছর আগেই অবশ্য পঞ্চানন বর্মার নামে কোচবিহারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। ইতিমধ্যে পঞ্চানন বর্মার জন্মস্থান কোচবিহারের খলিসামারিতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। তৃণমূল সূত্রে খবর, খসড়া ইস্তাহারে উত্তরবঙ্গজুড়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও কয়েকটি ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী এবং নমশূদ্র সম্প্রদায়ে ভোট বড় ফারাক গড়ে দিতে পারে। একইভাবে সংখ্যালঘুদের নস্যশেখ সম্প্রদায় উত্তরবঙ্গের ভোটে কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। এই সম্প্রদায়ের জন্য তৃণমূলের ইস্তাহারে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নস্যশেখ উন্নয়ন পর্ষদ গঠন করার প্রতিশ্রুতিও ইস্তাহারে থাকতে পারে। চা বাগান শ্রমিকদের ভোট ফিরিয়ে আনতে তৃণমূল মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচনি ইস্তাহারে সমস্ত চা বাগান শ্রমিকদের ঘর তৈরির প্রতিশ্রুতি সেই লক্ষ্যেই বলে মনে করা হচ্ছে।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী হল নস্যশেখ। সংখ্যালঘু সমাজের অন্তর্গত এই সম্প্রদায়ের ভোটও কম নয়। কার্যত রাজবংশী ও নস্যশেখ ভোট উত্তরবঙ্গের যে কোনও নির্বাচনে অন্যতম নির্ণায়ক শক্তি। নস্যশেখরা ইতিমধ্যে পৃথক উন্নয়ন পর্ষদের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবিটি ভেবে দেখার আশ্বাস দিলেও এখনও পর্ষদ ঘোষণা করেননি। বিধানসভা নির্বাচনের আগে ঘোষণার সম্ভাবনা প্রায় নেই। কিন্তু তৃণমূলের ইস্তাহারে বিধানসভা নির্বাচনে জিতলে নস্যশেখ উন্নয়ন পর্ষদ গড়ে দেওয়ার আশ্বাস থাকবে বলে জানা গিয়েছে। রাজবংশী ভোট ফিরবে কি না নিশ্চিত না হলেও তৃণমূল নমশূদ্র ভোট সম্পর্কে আশাবাদী। দলের নমশূদ্র সেলের রাজ্য সভাপতি মুকুল বৈরাগ্য বলেন, রাজ্যের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। উত্তরবঙ্গকে তিনি ঢেলে সাজিয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে প্রচুর প্রকল্প হবে যা নির্বাচনি ইস্তাহারেই প্রতিফলিত হবে। রাজবংশী ও কামতাপুরি ভোট ফেরাতে তৃণমূলের নেতাদের আশা বংশীবদন বর্মন ও অতুল রায়ের ভূমিকা। বংশীবদন গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের আরেকটি গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা। অতুল কেপিপির সভাপতি। এই দুজনই তৃণমূলের হয়ে প্রচার চালাবেন বলে তৃণমূলের বিশ্বাস। বিপরীতে, গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েনের অন্য গোষ্ঠীর নেতা অনন্ত মহারাজকে কাছে পেয়েছে বিজেপি। তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যে প্রচুর মামলা রয়েছে। পুলিশের খাতায় ফেরার হলেও তিনি এখন অসমে থাকেন। এলাকার বাইরে থেকে তাঁর প্রভাব আর আগের মতো কাজ করবে না বলে তৃণমূল নেতৃত্ব ধরে নিচ্ছেন। সেকারণে অনন্ত মহারাজের পালটা বংশীবদন ও অতুলের ওপর ভরসা এখন তৃণমূলের।