কালিয়াগঞ্জে সহ কয়েক জায়গায় চমক দিলেও জেলা কমিটিতে পুরোনোদেরই রাখল তৃণমূল

369

রায়গঞ্জ: বেশকিছু দিন থেকেই শহর তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি পদ পরিবর্তন নিয়ে কানাঘুষো চলছিল কালিয়াগঞ্জে। অবশেষে এল সেই সন্দিক্ষণ। শনিবার রায়গঞ্জে জেলা তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি অফিসে রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পাঠানো উত্তর দিনাজপুর জেলার নতুন সাংগঠনিক পদ ঘোষণা করা হল। এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল, জেলা কো-অর্ডিনেটর মোশারাফ হোসেন এবং জেলা যুব সভাপতি গৌতম পাল।

শহর ও ব্লকের মূল সংগঠনে কিছু কিছু জায়গায় পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্লক ও শহরের যুব সংগঠনেও পরিবর্তন হতে দেখা গেল এদিন। এদিন জেলা কমিটির চেয়ারম্যান, জেলা-সভাপতি, দুজন কো-অর্ডিনেটর এবং একজন মুখপাত্রের নামের পাশাপাশি ৮১ জনের কমিটি ঘোষিত হয়। মোশারফ হোসেন ও মনোদেব সিনহাকে কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রায়গঞ্জ পুরসভার চেয়ারম্যান সন্দীপ বিশ্বাসকে মুখপাত্র করা হয়েছে। চেয়ারম্যান করা হয়েছে ইটাহারের বিধায়ক অমল আচার্যকে।

- Advertisement -

পাশাপাশি ১০টি ব্লক ও ৪টি শহর কমিটির সভাপতি ও সহ সভাপতিদের নাম ঘোষিত হয়। জেলা, ব্লক ও শহর যুব কমিটির পদাধিকারীদের নাম ঘোষণা করেন জেলা যুব সভাপতি গৌতম পাল। কালিয়াগঞ্জ ব্লকে নিতাই বৈশ্যকে সভাপতি হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব দিলেও শহরের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন, জনসংযোগে এগিয়ে অনেকাংশে এগিয়ে কমল ঘোষে ভরসা রাখল তৃণমূল কংগ্রেস।

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কমল ঘোষকে শহর সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে তৃণমূল কার্যত মাস্টারস্ট্রোক দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কালিয়াগঞ্জ পুরসভার প্রশাসনিক বোর্ডের চেয়ারম্যান কার্তিক পালকে শহর সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে কমল ঘোষকে দায়িত্ব দেওয়া হল। আগামী বিধানসভা ও পুরসভা নির্বাচনে কমলবাবুই নেতৃত্ব দেবেন। যদিও এ ব্যাপারে কার্তিকবাবুর দাবি, দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। দলের একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাবেন। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কালিয়াগঞ্জ আসনটি আবার জিতিয়ে নিয়ে আসা আমার মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

কালিয়াগঞ্জ শহর সভাপতির পদ নিয়ে বেশ কিছুদিন টানাপোড়েন চলছিল। বিধায়ক তপন দেবশর্মা দলকে জানিয়েছিলেন, শহর সভাপতির পদে পরিবর্তন না করলে তিনি বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেবেন। শেষ পর্যন্ত দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিধায়কের দাবি মেনে নেওয়ায় কার্তিকবাবুর অনুগামীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। যদিও বিধায়ক একথা মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, দলের রাজ্য নেতৃত্ব এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সবাই নিলেই কাজ করব। আমাদের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। জেলা সভাপতি বলেন, দলের রাজ্য নেতৃত্ব পদাধিকারীদের নাম মনোনীত করেছে। এক্ষেত্রে হয়ত এক ব্যক্তি এক পদ নীতি মানা হয়েছে। কোনও বিরোধ নেই। এক সঙ্গেই সবাই কাজ করবেন। জেলা কমিটিতেও জায়গা পাননি কার্তিকবাবু।

নবনিযুক্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি কালিয়াগঞ্জ শহর কমল ঘোষ বলেন, আমি নয় আমরা হিসেবেই এই দলে সাংগঠনিক কাজ হবে। শহরের সমস্ত শাখা সংগঠনগুলোকে নিয়ে মূল দলের সঙ্গে একত্র করে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে শহর থেকে বিপুল পরিমাণ লিড দিয়ে কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেব। একই যুক্তিতে হেমতাবাদ ব্লকের সভাপতি পদ থেকে প্রফুল্ল বর্মনকে সরিয়ে হেমতাবাদ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শেখর রায়কে ব্লক সভাপতি করা হয়েছে। প্রফুল্লবাবু যেহেতু একই সঙ্গে হেমতাবাদ বিধানসভার কো-অর্ডিনেটর তাই হয়ত এই পরিবর্তন। প্রশ্ন উঠেছে, শেখরবাবু কি করে এক সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ও ব্লক সভাপতির পদ পেলেন।

প্রফুল্লবাবু জানান, দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে হেমতাবাদ আসনটিতে জয় নিয়ে আসা প্রধান লক্ষ্য। দিদি যে দায়িত্ব দেবেন তা পালন করবেন। রায়গঞ্জ শহর ও ব্লক সভাপতি পদে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। ইটাহারেও অমিত গাঙ্গুলিকে ব্লক সভাপতি পদে রেখে দেওয়া হয়েছে। কালিয়াগঞ্জ ও রায়গঞ্জে যুব সভাপতিদের পরিবর্তন করা হয়েছে। করণদিঘি ব্লক তৃণমূল সভাপতি পদে সুভাষ সিনহা সরিয়ে বিধায়ক মনোদেব সিনহার অনুগামী ওয়াব আলিকে সভাপতি করা হয়েছে।

প্রাক্তন ব্লক সভাপতি সুভাষ সিনহা বলেন, কাল পর্যন্ত আবার সভাপতি হচ্ছি জানতাম। কিন্ত বিধায়ক মনোদেব সিনহা বিধানসভার টিকিটের জন্য আমাকে সরিয়ে দিয়েছে। আমাকে না সরালে উনি পদত্যাগ করবেন হুমকি দিয়েছিলেন। তাই রাজ্য নেতৃত্ব আমাকে সরিয়ে দিলেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে উনি হারবেন। কেউ ওনাকে জেতাতে পারবেন না। কারণ নিজের পরিবারের ছাড়া কারও জন্য কিছু করেননি। নিজের বুদ্ধিতে উনি চলেন না, দাদার বুদ্ধিতে চলেন। তবে আমি দলের একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাব। বিধায়ক মনোদেব সিনহা বলেন, আমি দুমাস ধরে অসুস্থ। সাতদিন হল হায়দরাবাদে এসেছি। তাই কে কি বলেছে জানি না। রাজ্য নেতৃত্ব সব ঠিক করেছে।

অন্যদিকে, ডালখোলা শহর সভাপতি পদে তনয় দে পুনরায় দায়িত্ব পেয়েছেন। গোয়ালপোখর-২ ব্লকের সভাপতি পদে পরিববর্তন আনা হয়েছে। মিনহাজ আরফিন আজাদকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে সেতাবুদ্দিনকে। গোয়ালপোখর-১, ইসলামপুর শহর ও ব্লক এবং চোপড়ায় সভাপতি পদে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। নবগঠিত জেলা কমিটির উপদেষ্টামন্ডলীতে সভাধিপতি ও সহকারি সভাধিপতি ছাড়া মূল কমিটিতে কোনও মহিলা নেত্রীকে রাখা হয়নি।

জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়ালের যুক্তি, এক ব্যক্তি এক পদ যুক্তিকে সামনে রেখে রাজ্য নেতৃত্ব দায়িত্ব বণ্টন করেছে। এক ব্যক্তি এক সঙ্গে দুটো ক্ষেত্রে দলের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে থাকতে পারবেন না, তবে এক সঙ্গে দুটো ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে থাকতে পারবেন। সে কারণে কার্তিক পাল, প্রফুল্ল বর্মণ সহ অনেককেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্ত কানাইয়াবাবু একই সঙ্গে দলের জেলা সভাপতি, অন্যদিকে ইসলামপুর পুরসভার প্রশাসক বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি দুটি পদেই দলের মনোনীত প্রতিনিধি। শুধু উনিই নন, নবগঠিত জেলা কমিটির অনেক সদস্য সরকারি বিভিন্ন কমিটি ও দলের দায়িত্বে এসেছেন।

বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ী বলেন, যারা পদচ্যুত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আমরা তাঁদের দলে স্বাগত জানিয়েছি। কালিয়াগঞ্জ পুরসভার প্রশাসনিক বোর্ডের চেয়ারম্যান কার্তিক পাল বলেন, আমি কোনওদিনই বিজেপিতে যাব না। আমার মূল লক্ষ্য কালিয়াগঞ্জ আসনটি ধরে রাখা। বিজেপি জেলা সভাপতি কার কথা বলেছেন উনিই বলতেন পারবেন। কালিয়াগঞ্জ শহরে, হেমতাবাদ, করণদিঘি ও গোয়ালপোখর-২ ব্লকে ব্লক সভাপতিদের পরিবর্তন করায় তাঁদের অনুগামীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। যদিও জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাননি। অন্যদিকে, চোপড়া, কালিয়াগঞ্জ এবং রায়গঞ্জ ব্লক ও শহর যুবর সভাপতিদের পরিবর্তন করা হয়েছে।