মন্ত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে বিস্মৃত দুই নিহত তৃণমূল কর্মী

102

ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি : ইস্টার্ন বাইপাসে ফাড়াবাড়ির নেপালি বস্তির বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব পম্পা ছেত্রীর সংসারে অনটন লেগেই রয়েছে। দিন আনি দিন খাই পরিবারে প্রধান আয়ের পথ চাষ-আবাদ। বাড়ির পাশেই ছোট জায়গায় চাষবাস করে সংসার চালান পম্পা। সেখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে, ঘোগোমালিতে দেখা হল সাধনা সাহার সঙ্গে। বয়স অনেকটা পম্পার মতোই। পরিস্থিতি আরও খারাপ। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন।
পম্পা এবং সাধনা কে? কেন ভোটের আবহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই স্বামীহারা বৃদ্ধাদের নাম?

পম্পার স্বামী তিলকবাহাদুর ছেত্রী এবং সাধনার স্বামী টোকন সাহা আজ আর নেই। ২৩ বছর আগে এক রাজনৈতিক সভাকে কেন্দ্র করে খুন হন তৃণমূল-অন্ত প্রাণ ওই দুজন। মাত্র মাস চারেক আগে তৈরি হয়েছিল তৃণমূল। শিলিগুড়ির রাজনীতির লোকেরা সবাই জানেন, হামলাটা আসলে হয়েছিল গৌতম দেবের উপর। গৌতমকে বাঁচাতে গিয়ে মারা যান ওঁরা। তরোয়ালের কোপে মাথা প্রায় দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল টোকনের।
কেউ কি মনে রেখেছে ওই দুজনকে?

- Advertisement -

এই ঘটনার পর থেকে বহুবার তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরে তাঁদের পরিবার সাহায্যের আবেদন করলেও তাতে সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ। এরপর ২০১১-তে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেন পম্পা। তাঁর কথায়, বছর চারেক আগে আমাদের এলাকায় তৃণমূলের এক সভা হয়েছিল। সেখানে আমাকে ডেকে একটি গায়ে চাদর দিয়ে সম্মান জানানো হয়। ব্যাস ওইটুকুই। আমরা কী খাচ্ছি, কী পরছি কেউ খোঁজ নেন না। একই অবস্থা টোকনের পরিবারের। তাঁর স্ত্রী সাধনার বক্তব্য, সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করি। বড় ছেলের একটা চাকরি হয়েছিল। কিন্তু তার শংসাপত্রে নাকি সমস্যা রয়েছে, সেই কথা বলে তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এখন বড় ছেলে টোটো চালায়।

ভোট কাকে দেন? বাহাদুরের ছেলে নীরজের বক্তব্য, তৃণমূলের কোনও নেতা আমাদের দেখেন না ঠিকই, তবে আমরা তৃণমূলটা করি, যেহেতু বাবা তৃণমূল করতেন। তবে  টোকনের ছেলে সঞ্জিতের কথায়, চাকরির জন্য অনেক  দৌড়েছি। কিছু হয়নি। বাবা যে নিজের জীবনটা দিল, তাতে কী লাভ হল? কী বলছেন মন্ত্রী গৌতম? যাঁদের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের কি দেখা উচিত ছিল না পার্টির? মন্ত্রীর উত্তর, টোকন সাহার ছেলেকে চাকরি দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু টেকনিকাল সমস্যার জন্য চাকরিটা চলে যায়। তিলকবাহাদুর ছেত্রীর ছেলেকে চাকরি দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁর মানসিক কিছু সমস্যার কারণে চাকরি হয়নি।

কী হয়েছিল সেদিন? দিনটি ছিল ১৯৯৮ সালের ২৪ মে। সদ্য আত্মপ্রকাশ হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষুদিরামপল্লির সভায় সেদিন এলোপাতাড়ি গুলি, মারধর চলে। সেদিনের ঘটনায় প্রাণে বাঁচলেও স্কুটারে এলাকা ছাড়ার সময় পিছন থেকে বাটাম দিয়ে গৌতমের মাথায় মারা হয়। প্রায় ১৫ দিন তিনি সেই সময় হাসপাতালে ছিলেন। অথচ তৃণমূলের সভায় যাওয়ার সেদিন আগাম প্রস্তুতি ছিল না ঘোগোমালির বাসিন্দা টোকনের। দুপুরে খেতে বসেছিলেন। হঠাত্ই এক বন্ধু এসে সভায় যাওয়ার কথা বলে। বাড়িতে ছেলের ধুম জ্বর। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, বাবা যেও না তুমি। আমার কাছে থাকো। কিন্তু তৃণমূল করার নেশায় ছুটে গিয়েছিলেন দলের সভায়। পরদিন বাড়ি ফিরেছিল তাঁর মৃতদেহ। এলাকার অনেককে নিয়ে সেদিন তৃণমূলের ডাকা মিছিলে গিয়েছিলেন তিলকবাহাদুর। বাড়ি থেকে অনেক মানা করা হয়েছিল। কিন্তু শোনেননি।

ওই এলাকায় দলের দায়িত্বে তখন তৃণমূল নেতা দুলাল দত্ত। তাঁর সব কথা মনে আছে আজও, সভায় যখন তৃণমূল নেতা খগেশ্বর রায় বক্তব্য রাখছিলেন, সেই সময়ই সিপিএমের একটি মিছিল সেখানে পৌঁছায়। এরপরই শুরু হয়ে যায় মারপিট, গোলাগুলি। তিলকবাহাদুর, টোকন সহ অনেককেই জখম করা হয়। তবে তিলকবাহাদুর ঘটনাস্থলেই মারা যান। টোকনকে একটি ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে পরদিন তিনি মারা যান।

ওই দুই তৃণমূল কর্মীর পাড়ার লোকেরা মন্ত্রী গৌতমের সঙ্গে দেখা হলে প্রথম প্রশ্নই হয়তো করবেন, ওঁদের ভুলে গেলেন? দুজনের স্ত্রী-পুত্রের মনে যে প্রশ্নটা দুই যুগ ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।