বালুরঘাটে স্বচ্ছ মুখ খুঁজছে তৃণমূল

সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট : শিয়রে পুরভোট এসে পড়ায় বালুরঘাটে হন্যে হয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির গ্রহণযোগ্য প্রার্থী খুঁজছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী কাউন্সিলারদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই নানারকম অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এমন অভিযোগও রয়েছে যাতে দলকে বারবার বিপাকে পড়তে হয়েছে। ফলে পুরসভার আসন্ন নির্বাচনের জন্য এদের ওপর ভরসা করতে পারছে না তৃণমূল। নির্বাচনে পুরোনো প্রার্থীদের অধিকাংশকেই ছেঁটে ফেলা হতে পারে বলেও হাওয়ায় খবর ভাসছে। পরিবর্তে বালুরঘাট পুরসভার জন্য একঝাঁক নতুন মুখের কথা ভাবা হচ্ছে।

তৃণমূলের অন্দরমহল সূত্রের খবর, ২৫ আসনের পুরসভায় অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নতুন প্রার্থী থাকবেন। এর মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। শিল্পী, শিক্ষক, আইনজীবীদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের পেশায় থেকেও সমাজসেবামূলক কাজে ছাপ রেখেছেন এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্য, এমন মানুষদেরই এবারে প্রার্থী তালিকায় ঠাঁই হতে পারে। আগেই ইঙ্গিত মিলেছিল যে, স্থানীয়স্তরে বিশেষ সমীক্ষার মাধ্যমে এবারের ভোটের প্রার্থী তালিকা তৈরি হবে। সেই সমীক্ষা থেকেই অন্তত ৭০ শতাংশের বেশি প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা ভেসে উঠেছে। চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই সমীক্ষার কাজ এবং ওয়ার্ডভিত্তিক একাধিক প্রার্থীর নাম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচন নামে পুরভোট হলেও ২০২১ সালের বিধানসভার কথা ভেবেই পরিকল্পনা তৈরি করছেন তৃণমূল নেতারা। সেই কারণেও এবারের প্রার্থী তালিকায় বড়োসড়ো রদবদল হওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।

- Advertisement -

২০১৩ সালে বালুরঘাট পুরসভা প্রথমবারের জন্যে দখল নিয়েছিল তৃণমূল। সেবার ২৫ আসনের পুরসভায় ১৪টি আসন পেয়েছিল তৃণমূল। বামেরা ১১টি আসন পেয়ে ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলেছিল। এরপর থেকেই শুরু হয়েছিল তৃণমূল কাউন্সিলারদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। তৎকালীন চেয়ারম্যানকে সরানোর প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে তাদের নানা কর্মকাণ্ডে দলকে বারবার অস্বস্তিতে পড়তে হয়। এমনকি তৃণমূল বোর্ডের পুর পরিচালনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। যার ফলে বালুরঘাট শহরে দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা হারাতে থাকে তৃণমূল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে শহরের অধিকাংশ আসনেই পিছিয়ে ছিল তারা। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তাদের এই পুরসভায় পিছিয়ে থাকতে হয়। গত লোকসভা নির্বাচনে প্রবল চেষ্টা করেও তৃণমূল প্রার্থীকে এই পুর এলাকার সব আসনেই হারের মুখ দেখতে হয়েছিল। তারপর থেকেই পুরসভার জনপ্রতিনিধিদের বদলে দেওয়ার একটি আওয়াজ দলের অন্দরেই উঠেই গিয়েছিল। এরপর পুর নির্বাচনের হাওয়া উঠতেই দলের নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠেন। সমীক্ষক দল নামিয়ে পুরসভার জনপ্রতিনিধি ও পরিসেবা নিয়ে খোঁজখবর শুরু হয়।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাস থেকে এই পুরসভায় কোন নির্বাচিত বোর্ড না থাকলেও, প্রশাসক বোর্ডের আড়ালে কার্যত তৃণমূলের হাতেই পুরসভা পরিচালনার ভার রয়ে গিয়েছে। নিয়ম অনুয়াযী মহকুমাশাসক প্রশাসক পদে থাকলেও, তৃণমূল জেলা সভাপতি অর্পিতা ঘোষ ও প্রাক্তন মন্ত্রী শংকর চক্রবর্তী প্রশাসক বোর্ডে রয়েছেন। বালুরঘাট পুরসভার চূড়ান্ত সংরক্ষণ তালিকা প্রকাশ হওয়ার পরপরই, গত বোর্ডের কাউন্সিলারদের বদলে ফেলে নতুন মুখ আনার বিষয়ে দলের অন্দরেই চর্চা শুরু হয়ে যায়। এবার চকভৃগু এলাকার তিনটি ওয়ার্ড যুক্ত হয়েছে বালুরঘাট পুরসভায়। ওই ওয়ার্ডগুলিতে তো নতুন মুখ থাকছেই। পাশাপাশি গত বোর্ডের চেয়ারম্যান রাজেন শীল সহ অনেক তৃণমূল কাউন্সিলারের ওয়ার্ড সংরক্ষণের আওতায় পড়ে গিয়েছে। ওই আসনগুলিতেও নতুন মুখের ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো কাউন্সিলারদেরও অন্য ওয়ার্ডে পুনর্বাসন দেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে দলের অন্দরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই বালুরঘাট পুরসভার ২৫টি ওয়ার্ডে সমীক্ষার কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।

তৃণমূলের শহর সভাপতি সুভাষ চাকি বলেন, মানুষের ইচ্ছের কথা জেনে প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হবে। ইতিমধ্যেই আমি নিজে পুরসভার অনেক ওয়ার্ড ঘুরেছি। মানুষের মতামত জেনেছি। দলও নানাভাবে সমীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। ফলে প্রার্থী তালিকায় নতুন মুখ থাকতে পারে। তবে কজন থাকবে তা নিয়ে কিছু বলার সময় আসেনি। এটুকু বলতে পারি এলাকাবাসীর পছন্দের মানুষই তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার পাবেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির একাধিক প্রার্থীর তালিকা তৈরি করার কাজ শুরু হয়েছে। দলের যে সমীক্ষা শুরু হয়েছে তাতে করে ছাত্র-যুব এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের নাম প্রার্থী হিসেবে উঠে আসছে। দলের এক প্রভাবশালী নেতা বলেন, আগামী বিধানসভার দিকে নজর রেখেই একটি তরুণতুর্কি বাহিনী তৈরি করা প্রয়োজন। পুরসভা নির্বাচনকে তারই প্রস্তুতি হিসাবে দেখা হচ্ছে।