দার্জিলিং পাহাড়ে একার ক্ষমতায় কিছু করতে পারবে না তৃণমূল বা বিজেপি

575

দার্জিলিং ব্যুরো : একটা কথা স্বীকার করে নেওয়াই যায়-১৯৮০ সালে সুবাস ঘিসিং গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট তৈরির পর থেকে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ আর কোনওদিন এই রাজ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়নি। আসলে এই বিভেদের বীজটা ঘিসিং অনেকদিন আগেই পুঁতেছিলেন। সয়ত্নে গাছের চারা ছড়িয়েছিলেন পাহাড়ের মানুষের মনে। তখন অসীম ঔদ্ধত্যে চোখ বন্ধ থাকায় রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি সিপিএম তথা বামফ্রন্ট সেই গাছটাকে দেখতে পায়নি। যখন দেখতে পেল তখন তার শিকড় এত দূর ছড়িয়েছে যে তাকে ওপড়ানোর ক্ষমতা জ্যোতি বসুরও ছিল না। ঘিসিং যতদিন পাহাড়ের অধিপতি ছিলেন ততদিন তিনি দার্জিলিং পাহাড়ে বামেদের আর ট্যাঁ-ফোঁ করতে দেননি। গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে পাহাড়কে এককাট্টা করে তিনি রাজ্য-কেন্দ্রকে বাধ্য করেছিলেন দরাদরির রাস্তায় বসতে। ততদিনে পাহাড়ের পাগলা মাস্টারজি পোক্ত রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন। ঘিসিং বুঝেছিলেন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে দার্জিলিংকে আলাদা রাজ্য করা কেন্দ্রের পক্ষেও শক্ত। আর পশ্চিমবঙ্গ তো তার এলাকা ভেঙে পৃথক রাজ্য করায় কোনওদিনই সায় দেবে না। তাই দরাদরির রাস্তায় হেঁটে ১৯৮৮ সালে স্বশাসিত দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (ডিজিএইচসি) আদায় করে নিয়ে রক্তক্ষয়ী রাজনীতির পথ থেকে সরে গিয়েছিলেন তিনি।

পাহাড় কিন্তু আলাদা রাজ্যের স্বপ্ন ভোলেনি। তাদের সেই সুপ্ত স্বপ্নকে উসকে দিয়ে ২০০৭ সালে পাহাড়ে জন্ম নিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। ঘিসিংকে পাহাড়ছাড়া করে পাহাড়ের দখল নিলেন তাঁর একসময়ের মাসলম্যান বিমল গুরুং। প্রায় দুদশক ধরে রাজ্যের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ঘিসিং ডিজিএইচসি চালালেও তিনি কিন্তু পাহাড়ের মানুষের থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। সেই সুযোগটাই বিমল গুরুং-রোশন গিরি-হরকাবাহাদুর ছেত্রীরা নিয়েছিলেন। ঘিসিং জমানার মতোই পাহাড়ে তাণ্ডব শুরু করে মোর্চার উত্থান। তাঁদের তাণ্ডবে অশোক ভট্টাচার্য-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের দার্জিলিং মোড় পেরোনোর সাহস হয়নি। বাংলার নেতারা আর পাহাড়ে পা রাখতে পারবেন না, এই ধারণা পাহাড়ের মানুষের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বিমলরা। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবস্থাটা বদলালেন। প্রথম ধাপে বিমল গুরুংদের সঙ্গে সখ্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে পাহাড়ে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী। পাহাড়ের কথা শুনবেন, মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তায় আপ্লুত বিমল গুরুংরা তৃণমূলকে পা রাখতে দিল পাহাড়ে। কয়েক বছর বিমলদের সঙ্গে সখ্যের পরই স্বার্থের সংঘাত শুরু। আলাদা রাজ্যের দাবি মানবেন না বলে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিলেন রাফ অ্যান্ড টাফ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।  তখন থেকে পাহাড়ে আবার আগুনে রাজনীতি শুরু। বনধ, হামলা, পর্যটকদের ঢুকতে না দেওয়া- পুরোনা হিংসাত্মক রাজনীতির পথেই বিমলরা ফেরেন। কিন্তু ততদিনে পরিস্থিতি বদলেছে। রক্ত-আগুন-হিংসার রাজনীতি করতে গিয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বারবার পাহাড়ের আর্থিক বুনিয়াদ পর্যটনে ধাক্কা পড়েছে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ আলাদা রাজ্যের দাবিকে মনেপ্রাণে সমর্থন করলেও বিমলদের হিংসাত্মক রাজনীতি মানতে পারছিলেন না। তাছাড়া বাম আমলের ভুল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেননি। বিমলদের তাণ্ডবের মধ্যেই পাহাড়ে গিয়ে তিনি বার্তা দিয়েছেন, দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গেরই অংশ।

- Advertisement -

মমতার রাজনৈতিক চালে কোণঠাসা বিমল গুরুংরা আগুনে রাজনীতি পথে পা দিয়ে ভুল করেন। আইনি ফাঁদে পড়ে পাহাড় ছাড়তে হয় বিমল-রোশনকে। ঠিক এই সময়টার অপেক্ষায় ছিলেন মমতা। বিমলের ঘর থেকে বিনয় তামাং-অনীত থাপাদের ভাঙিয়ে এনে তিনি বিমল গুরুংয়ের বিকল্প মোর্চা তৈরি করে দিলেন পাহাড়ে। বিনয়রা যে নিজেদের স্বার্থেই পাহাড়ে বিমলকে ফিরতে দেবেন না, সেটা মমতার বুঝতে দেরি হয়নি। প্রায় দুবছর ধরে পাহাড়ছাড়া থাকার পর্বে বিমলরাও বুঝেছেন, সংঘাতের রাজনীতি করে তাঁদের লাভ হয়নি। বরং পাহাড়ছাড়া হওয়ায় তাঁদের শূন্যস্থানে জাঁকিয়ে বসছেন বিনয়রা। ফলে কিছুদিন আগে রাজ্যের সঙ্গে সন্ধির বার্তা দিয়ে পাহাড়ে ফেরার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

পাহাড়ের এই পরিস্থিতিটাকে অত্যন্ত সহজে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে কেন্দ্রের শাসকদল। এমনিতেই বরাবরই এ রাজ্যে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীনরা সরকারে থাকে না। ফলে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের বরাবরই একটা বিরোধ থাকে। পাহাড়ের ইস্যুতে রাজ্যকে চাপে রাখার সুযোগ কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল হাতছাড়া করেনি। ফলে পাহাড়ে প্রথমে সুবাস ঘিসিং এবং পরবর্তীতে বিমল গুরুংদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস ও বিজেপি দার্জিলিং লোকসভা আসনে নিজেদের প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেছে। ২০০৪ সাল, দাওয়া নরবুলা তবু পাহাড়ের মানুষ ছিলেন। যশবন্ত সিং এবং সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া তো পাহাড়ে সিনেমার অতিথিশিল্পীর মতো মুখ দেখিয়েছেন। বরং বিমলের শেষপর্বে বিজেপি রাজু বিস্টকে পাহাড়ে জিতিয়ে এনে তুলনায় ভালো করেছে। পাহাড়ের গোটা পর্বে একটা বিষয় পরিষ্কার। তা হল, স্থানীয় কোনও নেতার হাতেই পাহাড়ের রাশ থাকবে। তাঁকে যে কুক্ষিগত করবে, পাহাড়ের লোকসভা আসনও তাঁর হাতে। পরিবর্তে স্থানীয় স্বশাসনের ক্ষমতা ও কোটি কোটি টাকার আর্থিক বরাদ্দ তাঁর হাতে দিতে হবে। সুবাস ঘিসিংয়ে জমানা থেকেই পাহাড়ের রাজনীতিতে এই ট্র‌্যাডিশন চলছে। সেটা মমতাও জানেন। ডিজিএইচসি ভেঙে গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) করে বিমলদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী কয়েক বছরে পাহাড়ে উন্নয়নের বরাদ্দ টাকা বিমলরা যেভাবে নয়ছয় করেছেন তাতেও মমতা একটি কথাও বলেননি। যখনই স্বার্থের সংঘাত শুরু হয়েছে তখন মুখ্যমন্ত্রী সেগুলিকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছেন।

রাজনীতির এই অঙ্কেই পাহাড়ের বিধানসভা আসন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দখলেই থাকে বরাবর। কালিম্পং আলাদা জেলা হলেও গত বিধানসভা ভোটের সময় দার্জিলিং মহকুমা ছিল। সেই হিসাবে দার্জিলিংয়ের তিনটি আসনেই বিমল গুরুং নিয়ন্ত্রিত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা জিতেছিল। কালিম্পং আলাদা জেলা হলেও পাহাড়ের তিনটি আসনে এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামান্য আলাদা। আমাদের সমীক্ষা বলছে, পাহাড়ের মানুষের মনে এখনও বিমল গুরুংয়ে প্রভাব অসীম। তিনি আবার ফিরে আসবেন, এমন আশায় থাকেন পাহাড়ের অসংখ্য মানুষ। মুখ্যমন্ত্রীর হাতের পুতুল হয়ে থাকা বিনয় তামাংকে পাহাড়ের অধিকাংশ মানুষ পছন্দ করেন না, একথা বিনয় এবং মুখ্যমন্ত্রী দুজনেই জানেন। তবে অনীত থাপা তুলনায় গ্রহণযোগ্য পাহাড়ের মানুষের কাছে। কিন্তু বিমলকে পাহাড়ে ফিরতে না দিয়ে প্রশাসনিক মদতে ভোট হলে বিনয় গোষ্ঠীর মোর্চা প্রার্থীরাই সম্ভবত পাহাড়ের তিনটি আসনে এগিয়ে থাকবেন। তবে বিমলের বিশ্বস্তরা পাহাড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা চুপিসারে প্রচার করতে পারবেন, রাজু বিস্ট পাহাড়ে বিজেপির ভাবমূর্তি কতটা তুলে ধরবেন- এসবের কিছুটা ছাপ ইভিএমে পড়বে। কালিম্পংয়ে এখনও হরকাবাহাদুরের প্রভাব রয়েছে। সুতরাং সেই আসনে বিনয়দের সঙ্গে হরকার লড়াই হতে পারে। পাহাড়ের উন্নয়নের প্রায় পুরোটাই  জিটিএর মাধ্যমে হয়। আর সেই জিটিএ এখন বিনয় তামাংদের হাতে। মুখ্যমন্ত্রী খুব বিবেচনা করেই শেষ মুহূর্তে এসে বিনয়দের হাতে ১৭৫ কোটি টাকার প্যাকেজ তুলে দিয়েছেন। এ টাকায় কাজ করলে তার কৃতিত্বের ভাগীদার হবেন মুখ্যমন্ত্রী। কাজ না করলে তার দায় পুরোপুরি যাবে বিনয়দের ঘাড়ে। তাছাড়া এই বিশাল বরাদ্দ বিনয়দের অন্তত ভোট পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর খুব একটা বিরোধিতা করতে দেবে না। মাঝেমধ্যে পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ডের কথা বলে পাহাড়ের মানুষের সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে বিমল অনুগতদের ভোট টানার চেষ্টা বিনয় করতে পারেন। তবে রাজ্যের বিরুদ্ধে আগুনে আন্দোলনে তিনি যাবেন না। এই বোঝাপড়াতেই তো তিনি পাহাড়ে ক্ষমতায় এসেছেন। আর বিনয়কে সামনে রেখেই পাহাড় শাসন করতে চান মমতা। একটা কথা সোজাসুজি বলে ফেলাই যায়- একার ক্ষমতায় তৃণমূল, বিজেপি কারও পক্ষেই পাহাড়ে কিছু করা সম্ভব হবে না।