অস্ত্র দুয়ারে সরকার, ভোট বাড়াচ্ছে তৃণমূল

575

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : সরকারি কর্মসূচিকে কাজে লাগিয়ে নিঃশব্দে নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়াচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। সম্প্রতি দুয়ারে সরকার নামে রাজ্য সরকারের যে কর্মসূচি চালু হয়েছে তার আওতায়  স্বাস্থ্যসাথী, খাদ্যসাথী, শিক্ষাশ্রী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, ঐক্যশ্রী, মানবিক, কৃষকবন্ধু, একশো দিনের কাজ, কাস্ট সার্টিফিকেট সহ ১৩টি কর্মসূচি রয়েছে। দুয়ারে সরকারের মাধ্যমে খুব সহজেই সাধারণ মানুষ এইসব প্রকল্পে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করাতে পারছেন। বিশেষ করে, জাতিগত শংসাপত্র নিয়ে এতদিন বহু মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। তা নিয়ে ক্ষোভ কম ছিল না। কিন্তু দুয়ারে সরকার আসায় শিবির থেকে অনেকেই শংসাপত্র হাতে পেয়ে গিয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, গত এক বছরে গোটা জেলায় যত মানুষ কাস্ট সার্টিফিকেট পেয়েছেন দুয়ারে সরকারে গত এক মাসের সামান্য বেশি সময়ে তার পাঁচগুণ লোকের কাছে কাস্ট সার্টিফিকেট পৌঁছেছে। আবার খাদ্যসাথীতে রেশন কার্ড পেয়েছেন অনেকে।  এছাড়াও চোখের আলো প্রকল্পেও ক্যাম্পগুলিতে মানুষ চোখের চিকিৎসা করানোর পাশাপাশি বিনা পয়সায় চশমা পাচ্ছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে এর প্রভাব অবশ্যই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পড়বে। সরকারি প্রকল্পে কাজ হওয়ায় অনেকেই আবার মা-মাটি-মানুষের সরকারকে ক্ষমতায় ফেরাবে বলে আশা করছেন তৃণমূলের নেতারাও। সরকারি প্রকল্পগুলি যেহেতু আগে থেকেই শুরু হয়েছে তাই নির্বাচন ঘোষণা হলেও সেগুলি চালিয়ে যেতে রাজ্য সরকারের কোনও বাধা থাকবে না। কোচবিহার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কাস্ট সার্টিফিকেট বা জাতিগত শংসাপত্রের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১ লক্ষ ২৫ হাজার। এর মধ্যে ১ লক্ষ ১১ হাজার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়ে গিয়েছে। কাগজপত্রে অসংগতি থাকায় বেশ কিছু আবেদন বাতিল হয়েছে। কাস্ট সার্টিফিকেটের বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য জেলায় ৩০০-রও বেশি এনকোয়ারি টিম তৈরি করা হয়েছে। অথচ গত বছরে সবমিলিয়ে এই শংসাপত্রের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ২০ হাজার। অর্থাৎ গত এক বছরে যত কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে গত ৪০ দিনে তার প্রায় ছয়গুণ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসাথীর জন্য দুয়ারে সরকারে আবেদন জমা পড়েছে ২ লাখ ২ হাজার। এর মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এখনও পর্যন্ত ১ লাখ ৪৯ হাজার। কার্ড হাতে পেয়েছেন ৮০ হাজার। খাদ্যসাথীর জন্য আবেদন জমা পড়েছে ২৮ হাজার ৪০১টি। ২৪ হাজার জনকে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাশ্রীর জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১,২০৭টি। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশ দেওয়া হয়েছে। কন্যাশ্রীর জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১২ হাজার, দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৫০০ জনকে। রূপশ্রীর ৪,১০০ আবেদনের মধ্যে তা দেওয়া হয়েছে ৩,৬০০ জনকে। ২০০টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে। ঐক্যশ্রীর জন্য আবেদন জমা পড়েছে ৪,৯৮৯টি। দেওয়া হয়েছে মোট ৪,৯৫৪ জনকে। একশো দিনের কাজের বিভিন্ন বিভাগে দুয়ারে সরকারে মোট আবেদন জমা পড়েছে  প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় এক লক্ষ লোককে এর আওতায় আনা হয়েছে। কৃষকবন্ধুর জন্য আবেদন জমা পড়েছে ২৩ হাজার ৩০০টি। এর মধ্যে ১,৫০০ আবেদন বাতিল করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে ২০ হাজারের বেশি জনকে। মানবিকের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১,৯২১টি। এর মধ্যে ৯৯.৫ শতাংশ আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে। প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া হয়েছে ১,৭০০ জনকে। তবে জয় জহার নিয়ে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পেনশন আগেই সকলকে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য দুয়ারে সরকারে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র দুটি। দুজনকেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুয়ারে সরকার ছাড়াও চোখের আলো প্রকল্পেও জেলায় এখন পর্যন্ত ৫,৩০০ জনকে বিনা পয়সায় চশমা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে প্রচুর মানুষের চোখের চিকিৎসাও করা হয়েছে।

- Advertisement -

জেলা তৃণমূলের নেতারা তো বটেই রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, সরকারি প্রকল্পের কার্ড হাতে পেয়ে অনেকেরই মন ঘুরে যাবে। বিশেষ করে কোচবিহার জেলায় তৃণমূল নেতাদের খেয়েখেয়ি দেখে যাঁরা বিরক্ত হয়ে অন্য কিছু ভাবছিলেন সরকারি সুবিধা পাওয়ার পর তাঁরাও নতুন করে ভাববেন। এটাই তৃণমূলকে অ্যাডভান্টেজ দেবে আগামী ভোটে। কোচবিহারের জেলা শাসক পবন কাদিয়ান বলেন, দুয়ারে সরকার সফল করায় কোচবিহারের মানুষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ওঁরা অনেক সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি কর্মীরাও খুব ভালো কাজ করছেন। সবমিলিয়ে কোচবিহারে ১০ লক্ষের বেশি মানুষ এখনও পর্যন্ত দুয়ারে সরকারে অংশ নিয়েছেন। আমরা সবাইকে সহযোগিতা করছি। অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন বলেন, ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দুয়ারে সরকারে ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৬৬টি সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে তপশিলি জাতির ৮৮ হাজার ৫৯৮টি, উপজাতির ৪০৬টি, ওবিসি-এ ৯,৩৬৩টি এবং ওবিসি-বি ৪,০৯৯টি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। এখনও প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার করে এই সার্টিফিকেট ইস্যু করা হচ্ছে। বিজেপির জেলা সভাপতি মালতী রাভা বলেন, তৃণমূল সরকার এতদিন কোনও কাজ করেনি বলেই আজ তাদের দুয়ারে সরকার করতে হচ্ছে। কিন্তু দুয়ারে সরকারেও ওরা পুরোপুরি ব্যর্থ। এখান থেকে যে কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে তার অধিকাংশই ভুলে ভরা। তাতে মানুষের হয়রানি ও ক্ষোভ আরও বাড়ছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড নার্সিংহোমগুলি নিচ্ছে না। এতে নির্বাচনে সুবিধা পাওয়া তো দূরের কথা, তৃণমূল আরও ব্যাকফুটে যাবে।