প্রয়াত বাবার স্বপ্ন পূরণে দিনমজুরি মেধাবী দুই বোনের

249

কৌশিক দাস, ক্রান্তি : সঞ্জনা প্রজা ও আশা প্রজা। দুই বোন। লাটাগুড়ি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ছাত্রী। প্রথমজন ক্লাস সেভেন ও দ্বিতীয়জন ক্লাস টেন। দুজনেই পড়াশোনায় বেশ ভালো। প্রতি ক্লাসের মেধাতালিকায় প্রতিবার এক থেকে পাঁচের মধ্যে থাকাটা ওরা যেন নিয়মও করে ফেলেছে। দুই মেয়ে ভালো করে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু এক বছর হল তিনি নেই। তিনি থাকতে বাড়িতে অভাব না থাকলেও এখন তা খুবই প্রকট। পরিবারের সবার মুখে ভাত তুলে দিতে মা বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করেন। কিন্তু তাতেও অভাব-দৈত্যটা আর পিছু হটছে কই! বাবার দেখা স্বপ্নটাকে পূরণ করতে দুই বোন নিজেরাই আজকাল অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে। তবে কোনও সাহায্য না পেলে তাদের পড়াশোনার মাঝপথেই থমকে যাওয়ার আশঙ্কা।

সঞ্জনা-আশার বাবা দিলীপবাবুর স্ত্রী ও পাঁচ ছেলেমেয়েকে নিয়ে ক্রান্তি গ্রাম পঞ্চায়েতের পালপাড়ার শেষ সীমান্তে বসবাস ছিল। চাষাবাদ করে তিনি সংসার চালাতেন। সংসার মোটামুটিভাবে ভালো চললেও বছর চারেক আগে দিলীপবাবু ও তাঁর বড় ছেলে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ভালো চলার ছন্দে আচমকা পতন। দুজনের চিকিৎসার খরচ জোগাতে চাষের জমি বন্ধক দিতে হয়। বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর বছরখানেক আগে দিলীপবাবু মারা যান। তারপর থেকেই পরিবার বিপাকে। দুই বোনও। ক্লাস এইট পর্যন্ত স্কুলের হস্টেলে থাকার ব্যবস্থা থাকায় আশা ওই শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই থাকত। তার বোন হস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করে। করোনার জেরে হস্টেল বন্ধ। তারপর থেকে দুজনেই এখন বাড়িতে। আবাসিক পড়ুয়া হিসাবে তারা বিনামূল্যে খাবার, টিউশন সহ যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পেত বর্তমানে স্কুল বন্ধ থাকায় তারা সেসব থেকেই বঞ্চিত। বাড়ি বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেও মা কৌশল্যাদেবী সংসারের অভাব মেটাতে ব্যর্থ। নিজেদের বইপত্র, টিউশন ফির পাশাপাশি সংসারে কিছুটা খরচ দিতে দুই বোন আজকাল অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে।

- Advertisement -

আশা বলছে, অনেক অনেক পড়াশোনা করব বলে বাবা স্বপ্ন দেখতেন। আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাই। মায়ের একার পক্ষে এতজনের খরচ বহন করা সম্ভব নয়। তাই দুই বোন মিলে এভাবে পরিবারকে সাহায্যের চেষ্টা করছি। ছোট বোন সঞ্জনার কথায়, স্কুলকে খুব মিস করি। বাড়িতে পড়া দেখিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। হস্টেলে যখন থাকতাম তখন পড়াশোনাটা বেশ ভালো হত। কৌশল্যাদেবী বলছেন, পরিবারে সবার মুখে ভাত তুলে দিতে খুবই কষ্ট করতে হয়। করোনার কারণে সেভাবে মজুরিও মিলছে না। সরকার কিংবা কোন সহৃদয় ব্যক্তি আমাদের পাশে দাঁড়ালে দুই বোনের স্বপ্ন পূরণ হবে। ক্রান্তি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান বসুন্ধরা দাস বলছেন, চিন্তা নেই। আমরা পরিবারটির পাশে আছি। সঞ্জনা-আশার স্বপ্ন পূরণ করতে সমস্ত উদ্যোগই নেওয়া হবে।