পাহাড় সমস্যা সত্যিই মেটাতে চাইলে আলোচনার দরজা খোলা হোক

169

রণজিৎ ঘোষ : পাহাড় নিয়ে কয়ে দশকের টানাপোড়েন এখনও মেটেনি। আপাতশান্তি মনে হলেও এর পিছনে অশান্তির বীজ লুকিয়ে নেই, এমন কথা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। বিশেষ করে পাহাড় সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কথা বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ফায়দা লোটার চেষ্টার মধ্যে লুকিয়ে আছে অশান্তির বীজ। সম্প্রতি এক গোর্খালিগ নেতার অনশন ঘিরেও ছিল ফায়দা লোটার চেষ্টা।

বাস্তবে কেউই এই সমস্যা স্থায়ীভাবে মেটানোর চেষ্টা করেনি। অন্যদিকে মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলি কখনও ভেবে দেখেনি, কেন বারবার পাহাড়কে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা করার দাবি উঠছে। অথচ কেন্দ্র বা রাজ্যের শাসকরা যদি গুরুত্ব দিয়ে এই দাবির পিছনের যুক্তিগুলি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, তাহলে এতদিনে হয়তো সোনায় মুড়ে দেওয়া যেত আমাদের গর্বের দার্জিলিংকে।

- Advertisement -

আসলে রাজনৈতিক দলগুলি পাহাড়ের মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে গোর্খাল্যান্ড নামক একটা ললিপপ দেখিয়ে এখানকার মানুষকে বোকা বানিয়ে এসেছে এতকাল। অন্যদিকে, গোর্খাল্যান্ডের আবেগকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্র, রাজ্যের সহানুভূতি আদায় করে পাহাড়ের একশ্রেণির তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা কোটি কোটি টাকা লুট করেছে।

প্রশ্ন হল, বারবার গোর্খাল্যান্ডের দাবি ওঠে কেন? কারণ একটাই, অনুন্নয়ন। আলাদা করে কংগ্রেস, সিপিএম বা তৃণমূলকে দোষারোপ করে লাভ নেই। এ কথা হলফ করে বলাই যায় যে, পাহাড়ের প্রকৃত উন্নয়নে রাজ্য সরকার কোনও সময়ই নজর দেয়নি। শুধুমাত্র তোষামোদের রাজনীতি হয়েছে। কখনও সুবাস ঘিসিং, কখনও বিমল গুরুং, কখনও বিনয় তামাং। হালে আবার অনীত থাপাকে তুষ্ট করে পাহাড় হাতে রাখার চেষ্টা হয়েছে।

ওপরে যে নামগুলি বললাম, এঁরা প্রত্যেকে কোনও না কোনও সময় পাহাড়ের সর্বময়কর্তা হিসাবে নিজেদের জাহির করেছেন। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে উই ওয়ান্ট গোর্খাল্যান্ড আওয়াজ তুলে পাহাড়ের সাধাসিধে মানুষগুলোকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন। গোর্খাল্যান্ড নিশ্চিত বলে ভাষণ দিয়ে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্র এবং রাজ্যের কাছে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন।

গত শতকের আটের দশকে সুবাস ঘিসিংয়ে নেতৃত্বাধীন জিএনএলএফ গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে প্রথম পাহাড়জুড়ে আন্দোলন শুরু করেছিল। রাজ্যে তখন জ্যোতি বসুর নেতত্বাধীন বাম সরকার, কেন্দ্রে কংগ্রেস। পাহাড় ক্রমশ হিংসাত্মক হয়ে ওঠায় ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (ডিজিএইচসি) গঠন করে ঘিসিংকে নিরস্ত্র করেছিলেন জ্যোতি বসুরা।

তারপর ১৯৮৬ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ডিজিএইচসির মাধ্যমে পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য লালকুঠিকে বছরে অন্তত ২০০ কোটি টাকা দিত কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার। কিন্তু ডিজিএইচসি কি সেই অর্থে পাহাড়ের উন্নয়ন করতে পেরেছিল? পাহাড়ের সামগ্রিক উন্নয়ন করার কোনও মানসিকতা কি ছিল সেই সময়? যদি সত্যিই সরকারের দেওয়া অর্থে উন্নয়ন হত, তাহলে হয়তো আজ পাহাড়ের অর্থনীতি অনেক উন্নত হত।

ডিজিএইচসির আমলে কেন্দ্র এবং রাজ্য মিলে দার্জিলিংয়ে উন্নয়নে যে আর্থিক প্যাকেজ দিয়েছে, সুবাস ঘিসিংকে ডেকে সেই আয়-ব্যয়ের খরচ কখনোই চায়নি সরকার। বলা ভালো, সেই সাহসই বামফ্রন্ট সরকারের ছিল না। কেননা, সেই সময় পাহাড়ের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী সুবাস ঘিসিংকে চটালে কোনওদিনই আনন্দ পাঠক, এসপি লেপচা, রত্নবাহাদুর রাই সাংসদ হতেন না।

অশোক ভট্টাচার্যেরও শিলিগুড়ি বিধানসভায় জিততে মিরিক থেকে প্রচুর ভোট পাওয়ার পিছনে ঘিসিংয়ে অবদান ছিল। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র ভোটের কথা মাথায় রেখে ডিজিএইচসিকে দেওয়া টাকার হিসাব চেয়ে ঘিসিংয়ের বিরাগভাজন হওয়ার চেষ্টা করেনি সিপিএম।

২০০৭ সালের পর পাহাড়ের রাজনীতিতে পালাবদল হয়। সুবাস ঘিসিংয়ের জায়গায় নতুন দল তৈরি করে রাতারাতি জিরো থেকে হিরো হয়ে যান বিমল গুরুং। গোর্খাল্যান্ডের দাবি তুলে ধরে পাহাড়ে টানা আন্দোলন শুরু করেন গুরুংরা। কেন্দ্রে তখন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের সঙ্গে কথা বলে পাহাড়ের আন্দোলন দমাতে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের ব্যবস্থা করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতত্বাধীন বাম সরকার।

দুতিনটি বৈঠক হলেও বিমলরা পৃথক রাজ্যের দাবিতে অনড় থাকায় সমাধানসূত্র মেলেনি। বরং দিনদিন অশান্ত হয়েছে পাহাড়। ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ক্ষমতায় এসে তিন মাসের মধ্যে তিনি পাহাড় সমস্যার সমাধান করে দেবেন। করেছেনও। ২০১১ সালের মে মাসে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি বিমল গুরুংদের বুঝিয়ে গোর্খাল্যান্ডের দাবি থেকে তখনকার মতো নিরস্ত্র করে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) চুক্তি করান।

অনেকটা ডিজিএইচসির ধাঁচেই নতুন মোড়ক জুড়ে তৈরি হয় জিটিএ। যেখানে সুবাস ঘিসিং শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই ২০১২ সালে জিটিএর দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন বিমল গুরুং। এই সময়ে রাজ্য এবং কেন্দ্র বছরে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি পাহাড়ের উন্নয়নে জিটিএকে দিয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন সেই তিমিরেই ছিল।

প্রথম থেকেই অভিযোগ ছিল, প্রতিটি কাজের ওভারএস্টিমেট করে কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করেছে জিটিএ। বিমল গুরুংয়ে আমলে লালকুঠির এই আর্থিক নয়ছয় নিয়ে অনেকবার হিসাব চাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু চাইবে কে? বিমলকে চটালে পাহাড় অশান্ত হবে আশঙ্কায় তৃণমূলও বিমলের আমলে টুঁ শব্দটি করেনি। পরবর্তীতে বিনয় তামাং, অনীত থাপার হাতে জিটিএর প্রশাসনিক বোর্ড আসার পরেও ১,৭০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল জিএনএলএফ।

কিন্তু ২০১৭-২০২১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত জিটিএর আয়-ব্যয়ের কোনও স্পেশাল অডিট হয়নি। আসলে পাহাড়ের মানুষের আর্থসামাজিক কোনও উন্নয়নেই নজর দেওয়া হয়নি। এখনও পাহাড়ের একটা গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার কাঁচা রাস্তার ভাঙাচোরা অবস্থা। সর্বত্র বিদ্যুৎ পরিষেবা যেমন পৌঁছোয়নি, তেমনই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রোজগার সবকিছুই তলানিতে।

কর্মসংস্থানের কোনও ব্যবস্থা অতীতের ডিজিএইচসি বা পরবর্তীতে জিটিএ, কেউই করতে না পারায় বেকারত্ব পাহাড়ের একটা ভয়ংকর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু শিক্ষিত তরুণ-তরুণী সংসার চালানোর জন্য পাহাড় ছেড়ে ভিনরাজ্যে গিয়ে কাজ করছেন। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, চা, পর্যটন, সিঙ্কোনা শিল্পকে ঘিরে পাহাড়ে অনেক প্রকল্পে আশার বাণী শোনানো হয়েছিল ২০১৮ সালের হিল বিজনেস সামিটে।

প্রসিদ্ধ দার্জিলিংয়ে কমলালেবুকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার কথাও সেই সামিটে বলা হয়েছিল। কিন্তু কোথায় কী? শুধু আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি আর এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা অপচয় ছাড়া কিছু হয়নি। তবে আশার কথা হল, পাহাড় সমস্যা মেটাতে আবার আলোচনার দরজা খুলতে চলেছে।

আগামী মাসের শুরুতে পাহাড় সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাজ্য সরকার এই বৈঠকে শামিল হতে সম্মত হবে কি না? কেননা রাজ্যের সম্মতি ছাড়া ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ফলপ্রসূ হওয়া সম্ভব নয়। অথচ আলোচনা একবার শুরু হলে নিশ্চয়ই সমাধানসূত্র মিলবে।

বাংলার আপামর মানুষ চায়, পাহাড় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক। পাহাড় আবার হাসুক। পর্যটনে দেশের অন্যতম পীঠস্থান দার্জিলিং আবার স্বমহিমায় ফিরুক। সেজন্য আলোচনাটা শুরু হওয়া দরকার। কিন্তু শুধু যদি রাজনৈতিক স্বার্থে আবার আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আবার প্রশ্ন উঠবে, সত্যিই কি আমরা পাহাড় সমস্যা মেটাতে চাই? নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখতে চাই।