করোনা পরিস্থিতিতেও রায়গঞ্জ মেডিকেলে বহাল তবিয়তে দালালরাজ

346
ফাইল ছবি

রায়গঞ্জ: বেআইনিভাবে রোগীর আত্মীয়দের কাছে মোটা টাকা হাতিয়ে নেওয়া দালালদের দাপট রুখতে মুখ্যমন্ত্রী কড়া পদক্ষেপের কথা বললেও, বাস্তবে তার তোয়াক্কাই করছে না রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ট্রলিম্যানরা। বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ী এমনই গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

শুধু বিশ্বজিৎবাবু নয় কংগ্রেসের বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত থেকে শুরু করে সিপিএমের জেলা সম্পাদক অপূর্ব পালেরও একই অভিযোগ। এখানে রীতিমতো প্রভাবশালীর মদতে বহিরাগত ট্রলিম্যানরা বিভিন্ন ওয়ার্ডের রোগী নিয়ে যেতে মোটা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে রোগীর পরিজনদের থেকে। আগে এই দালালরা রোগীদের থেকে ২০০ টাকা করে আদায় করলেও করোনার আবহে দালালদের রেট বেড়ে হয়েছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।

- Advertisement -

প্রসূতি হোক আর কোনও দুর্ঘটনাগ্রস্ত রোগী হোক, রোগী ছুঁলেই নূন্যতম ৫০০ টাকা মেটাতে হচ্ছে পরিজনদের। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঠিকাদার সংস্থার যে ট্রলিম্যানরা রয়েছে তাঁদের ট্রলি ছুতেই দিচ্ছে না দালালচক্রের পান্ডারা। ফলে অসহায় রোগীর পরিজনেরা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে শুধুমাত্র ওয়ার্ডের রোগী পৌঁছানোর জন্য মোটা টাকা গুনতে হচ্ছে প্রতিবাদ করলেই শাসানি-হুমকি তো রয়েছে ওই দালাল চক্রের।

মাস তিনেক আগে কালিয়াগঞ্জে এক সরকারী অনুষ্ঠানে এসে মুখ্যমন্ত্রী রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের দালালচক্র নিয়ে রীতিমত ক্ষোভ উগরে দিয়ে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেন। ওই ঘটনার পর অতি সক্রিয় হয়ে সিআইডি ও জেলা পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ দালালদের একটি তালিকা তৈরি করে। সেই মোতাবেক ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে। অভিযুক্তদের জেলও খাটতে হয়।

এরপর পুলিশের সক্রিয়তায় উধাও হয়ে যায় দালাল চক্র। করোনা আবহে ফের দালাল চক্রের শিকড়-বাকড় ছড়িয়ে দিয়েছে। এতে নাভিশ্বাস হচ্ছে রোগীর পরিজনদের। নিখরচায় চিকিৎসা পেতে আসা রোগীর পরিজনদের ওয়ার্ডে পৌঁছাতেই অনৈতিক খরচ গুনতে হচ্ছে ৫০০-৭০০ টাকা। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরে আয়ারা তো রয়েছে। সন্তান প্রসব করলে আগে যেখানে ২০০-৫০০ টাকায় হয়ে যেতো এখন হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা নিচ্ছে একশ্রেণীর আয়ারা।

হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও বহিরাগত শতাধিক ট্রলিম্যান থেকে, আয়া এবং বিভিন্ন ভুঁইফোর প্যাথলজিক্যাল ল্যাব টেকনিশিয়ানরাও এখানে এসে নিজেদের রুটিরুজি বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে। সবার জন্যই গুনতে হচ্ছে রোগীর পরিজনদের মোটা অংকের টাকা। ফলে নিখরচায় চিকিৎসা অমিল রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। কতদিন চলবে এই দালালচক্রের দাদাগিরি? মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ সত্ত্বেও সেখানে পুলিশ প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় বলেই অভিযোগ বিভিন্ন মহলের।

ভুক্তভোগী রোগীর পরিজনেরা জানান, প্রশাসন বলে এখানে কিছু আছে তা মনে হয় না। দালালচক্র মুখ্যমন্ত্রীর সতর্ক করার পর কয়েকদিন পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও এখন কারোরই কোনও তৎপরতা নেই। এর পেছনে রয়েছে এক প্রভাবশালীর হাত। যাকে ভয় পায় চিকিৎসক-নার্স থেকে শুরু করে প্রশাসনেরও অনেক কর্তা।

উত্তর দিনাজপুর কৃষিনির্ভর জেলা। সীমিত আয়ের মানুষের বসবাস এখানে। মুখ্যমন্ত্রী সৎ উদ্যোগ নিয়ে একটি মেডিকেল কলেজ গড়ে মানুষকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যে প্রচেষ্টা, তা একটি চক্রের ফাঁদে পড়েছে ভেস্তে যেতে বসেছে। মানুষ আজও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আদৌ কী সমস্য়ার সমাধান হবে, সেই প্রশ্নই শাসকদের একাংশ থেকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলেও রয়েছে।

বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ী বলেন, আবার দালালরাজ শুরু হয়েছে। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীকে ওঠানো থেকে শুরু করে নামানো সিটি স্ক্যান করতে নিয়ে যাওয়া, ইউএসজি করতে নিয়ে যাওয়া অথবা এক্সরে করতে নিয়ে গেলে দফায় দফায় টাকা নেওয়া হয় রোগীর পরিবার পরিজনদের কাছ থেকে।

কংগ্রেসের বিধায়ক তথা জেলা কংগ্রেসের সভাপতি মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, দালালরাজ আবার মাথাচাড়া দিয়েছে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। রোগীর পরিবার পরিজনেরাই এই বিষয়ে আমাকে অভিযোগ করছে। বিষয়টি নিয়ে জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলব।

সিপিএমের জেলা সম্পাদক অপূর্ব পাল বলেন, লকডাউনের জেরে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ অভাব-অনটনে রয়েছে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে শুরু করে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত টাকা গুনতে হয়। এই বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনকে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

তৃণমূলের জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগারওয়াল বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে অভিযুক্ত দালালদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ব্যাপারে পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব। মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের মেডিকেল কলেজকে যেই কলঙ্কিত করুক না কেন, কাউকে রেয়াত করা হবে না।

রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের নোডাল অফিসার বিপ্লব হালদার বলেন, সমস্ত বিষয়টিই আমি জানি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।