দাদন দিয়ে এলাচ কিনে মুনাফা লুটছেন ব্যবসায়ীরা

648

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : প্রযুক্তির অভাবে এলাচের গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যবসায়ী চাষিদের দাদন দিয়ে কম টাকায় এলাচ কিনে নিচ্ছেন। ফলে চাষিদের মুনাফা হচ্ছে না। লাভের মোটা অঙ্ক ব্যবসায়ীদের কোষাগারেই ঢুকছে। দাদন প্রথা বন্ধ করে পাহাড়ের এলাচ হাবে চাষিদের স্বনির্ভর করতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর একাধিক পদক্ষেপ করছে। চাষিরা যাতে সরাসরি তাঁদের এলাচ দেশ-বিদেশের বাজারে বিক্রি করতে পারেন, তার জন্য বেশ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে শিল্প দপ্তরের কর্তারা আলোচনা শুরু করেছেন। পাহাড়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোঅপারেটিভ সোসাইটি তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে কালিম্পংয়ের দুটি সমবায় গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তাদের হাতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের তরফে কাঁচা এলাচ প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেটজাত করার একাধিক যন্ত্রপাতিও তুলে দেওয়া হয়েছে। দপ্তরের উত্তরবঙ্গের জয়েন্ট ডিরেক্টর দীপঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের বড় এলাচকে বিশ্বের বাজারে তুলে ধরতে পদক্ষেপ করা হয়েছে। চাষিরা যাতে তাঁদের ফসল সরাসরি বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে বিক্রি করতে পারেন তার জন্য চাষি ও বহুজাতিক সংস্থার কর্তাদের মধ্যে সরাসরি কথা বলিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্তও করা হবে।

স্পাইস বোর্ডের কালিম্পং আঞ্চলিক দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, পাহাড়ের দুই জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪,০০০ হেক্টর জমিতে বড় এলাচ চাষ হয়। ১০ হাজারেরও বেশি পরিবার ওই চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফি বছর পাহাড়ে প্রায় ১,১০০ মেট্রিক টন বড় এলাচ উৎপাদন হয়। কালিম্পংয়ে বেশি এলাচ উৎপাদন হয় বলে জানিয়েছেন বোর্ডের আধিকারিকরা। এককভাবে কালিম্পংয়ের তোদে, তাংতা এলাকাতেই সব থেকে বেশি এলাচ পাওয়া যায়। ওই এলাকায় প্রায় ২০০ মেট্রিক টন এলাচ উৎপাদন হয়। তোদের নয়শোর বেশি কৃষক এলাচ চাষের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও লাভা, লোলেগাঁও, সিলেরিগাঁও, ইচ্ছেগাঁও, পাবং, সিটং, বিজনবাড়িতেও প্রচুর পরিমাণে এলাচ চাষ হয়। কাঁচা এলাচ তোলার পর সেগুলি পুড়িয়ে প্রক্রিয়াকরণ করার পরই বাজারজাত করা হয়। প্রযুক্তির অভাবে পাহাড়ের চাষিরা মান্ধাতা আমলের মাটির ভাটা তৈরি করে সেখানেই এলাচ পোড়ান। তাতে সেই এলাচের রং ও গুণগতমানও কমে যায় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এলাচ প্রক্রিয়াকরণের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্র অনেক আগেই বাজারে এসেছে। সেগুলি চাষিদের কাছে পৌঁছে দিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর পদক্ষেপ করছে। দীপঙ্করবাবু জানিয়েছেন, গ্রাম পঞ্চায়েত বা ব্লকভিত্তিক চাষিদের নিয়ে সমবায় গোষ্ঠী করা হচ্ছে। সিটংয়ের সমবায় তৈরি হয়েছে। বিজনবাড়িতেও তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।

- Advertisement -

শিল্প দপ্তরের উদ্যোগে এলাচচাষিরা অবশ্য খুশি। তোদে, তাংতার চাষি সুরজ সুব্বা বলেন, শিলিগুড়ির কয়েকজন ব্যবসায়ী চাষের জন্য আমাদের অগ্রিম টাকা দেন। ফলে তাঁদের কাছেই আমরা এলাচ বিক্রি করতে বাধ্য থাকি। তাছাড়া কীভাবে বড় বাজারে এলাচ বিক্রি করতে হয় তার নানা পদ্ধতির কথাও আমাদের জানা নেই। শিল্প দপ্তর আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ শুরু করেছে। আমরা যদি সরাসরি এলাচ বিক্রি করতে পারি তাহলে নিশ্চিতভাবে লাভবান হব। সিলেরিগাঁওয়ের চাষি অমোদ তামাং বলেন, আমরা এলাচ পোড়ানো ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চেয়ে শিল্প দপ্তরের কাছে আবেদন করেছি। সেগুলি পেলে চাষের কাজের সুবিধা হবে। তোদে, তাংতাকে মডেল করেই পাহাড়ের এলাচ হাবে কাজ হবে বলে শিল্প দপ্তরের কর্তারা জানিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিদের তোদে, তাংতায় নিয়ে গিয়ে প্রক্রিয়াকরণের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন তাঁরা। নর্থবেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুরজিৎ পাল বলেন, বিশ্ব বাজারে পাহাড়ের এলাচের চাহিদা আছে। তবে যথেষ্ট সরকারি উদ্যোগের অভাবে চাষিরা মুনাফা করতে পারছেন না। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর অনেক দেরিতে হলেও যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা আরও সম্প্রসারিত হোক সেটাই চাই।