আলিপুরদুয়ার ব্যুরো, ৩০ এপ্রিলঃ রাতের অন্ধকারে নয়, দিনদুপুরে অবৈধভাবে কেটে ফেলা হচ্ছে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সেগুনগাছ। অভিযোগ, বনকর্মীদের একাংশের যোগসাজশে পূর্ব বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের নর্থ রায়ডাক রেঞ্জের ধওলাবস্তি লাগোয়া জঙ্গলের সেগুনগাছ দিনের আলোয় কেটে নিচ্ছে স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীরা।

নর্থ রায়াডাক রেঞ্জের আধিকারিক এবং বনকর্মীদের একাংশের মদতেই সপ্তাহখানেক ধরে জঙ্গলের গাছ কাটা চলছে। অথচ বিষয়টি জানেনই না বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট (সিসিএফ)। এমনকি পূর্ব বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টরও এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তাঁরা অবশ্য বিষয়টি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করার কথা বলেছেন। নর্থ রায়ডাক রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার অতনু ভাণ্ডারী জানান, তিনি চাকরিতে নতুন যোগ দিয়েছেন। নতুন প্ল্যান্টেশনের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও তাঁকে সেভাবে কিছু জানায়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে পূর্বতন রেঞ্জ অফিসার কেদার মাহাতো ধওলা নদী লাগোয়া জঙ্গলে যেভাবে রি-প্ল্যান্টেশন করেছিলেন, তিনিও সেভাবেই কাজ করছেন। তিনি বলেন, গাছের গোড়া থেকে ২-৩ বছরে যে চারাগাছ বড়ো হয়েছে, সেগুলো কেটে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেগুনগাছ কাটার কথা বলা হয়নি। দপ্তরের এমন অনুমতিও নেই। আমি কাউকে এমন নির্দেশ দিইনি।

ধওলাবস্তির কয়েকজন বাসিন্দা জানান, শুনেছি বন দপ্তর থেকে গাছ কাটা হচ্ছে। সেখানে নতুন করে গাছ লাগানো হবে। বন দপ্তরের স্থানীয় অফিস থেকে এমনটাই বলা হয়েছে। একজন ফরেস্ট গার্ডের কথায়, ৩০ হেক্টর জমিতে নতুন করে চারাগাছ লাগানো হবে। তাই এলাকার শ্রমিকদের দিয়ে ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করানো হচ্ছে। যদিও ধওলাবস্তির বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, বনসৃজনের নামে লুঠ করা হচ্ছে জঙ্গলের মূল্যবান গাছ। ইতিমধ্যেই যন্ত্রচালিত হাতকরাত দিয়ে কয়েকশো সেগুনগাছ অবৈধভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। ট্র‌্যাক্টর আর ভুটভুটিতে বোঝাই করে গাছের গুঁড়ি মজুত করা হচ্ছে তুরতুরি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বিভিন্ন জাযগায়। তুরতুরি, ধওলাবস্তি-১, নেপালিবস্তি, বর্মনপাড়া ছাড়াও শামুকতলার তালেশ্বরগুড়িতেও সেগুনগাছের গুঁড়ি মজুত করা হয়েছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শয়েশয়ে গাছ লুঠ হতে দেখে স্থানীয়দের একাংশ জ্বালানি সংগ্রহে লেগে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ এই সুযোগে কুড়ুল এবং হাতকরাত দিয়েও গাছ কেটে নিচ্ছেন। নর্থবেঙ্গল ফরেস্ট মজদুর ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক দীপক দাস বলেন, নতুন চারাগাছ লাগানোর জন্য ঝোপজঙ্গল পরিষ্কারের নামে বন দপ্তর গাছ কেটে ফেলার অনুমতি দিতে পারে না। এটা পুরোপুরি অবৈধভাবে হচ্ছে। একশ্রেণির বনকর্মী এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। ঘটনার উচ্চপর্যায়ে তদন্ত দাবি করছি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। তিনি বলেন, বন পাহারার পরিবর্তে কাঠ মাফিয়াদের সঙ্গে যোগসাজশ করে যারা বনজঙ্গল ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা উচিত।  তাঁর অভিযোগ, ন্যূনতম নিয়মটুকুও পালন করেননি নর্থ রায়ডাক রেঞ্জের আধিকারিক এবং বনকর্মীরা। স্থানীয় বন সুরক্ষা কমিটি, এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য, এমনকি বনবস্তি ও আশপাশের গ্রামবাসীদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনোরকম বৈঠক করা হয়নি।

বন সুরক্ষা কমিটিতে থাকা বিধায়ক জেমস কুজুরের মনোনীত ব্যক্তি কুন্দনসিং বড়াইক জানান, নতুন চারাগাছ লাগানো কিংবা ঝোপজঙ্গল পরিষ্কারের ব্যাপারে রেঞ্জ অফিসার বৈঠক করে রেজিলিউশন নেননি। তবে বিষযটি ফোনে জানিয়েছেন। লোকসভা নির্বাচনের কারণে তিনি বাইরে আছেন। জঙ্গলের গাছ অবৈধভাবে কেটে নেওয়ার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। আলিপুরদুয়ার নেচার ক্লাবের চেয়ারম্যান অমল দত্ত বলেন, নতুন চারাগাছ লাগানোর জন্য সংরক্ষিত জঙ্গলের পুরোনো গাছ কেটে ফেলার নিয়ম আছে বলে আমার জানা নেই। বন দপ্তর কোনোভাবেই এমন নির্দেশ দিতে পারে না। প্রশাসনের কর্মীদের একাংশের মদত ছাড়া স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের পক্ষে কখনোই দিনেরবেলা জঙ্গলে ঢুকে একের পর এক সেগুনগাছ কেটে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে যতদূর যেতে হয় আমরা পরিবেশপ্রেমীরা যাব।

পূর্ব বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর শ্রীহরিশ বলেন, এমন অভিযোগ পেয়েছি। গোটা বিষয়টি দেখার জন্য এডিএফও-কে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তিনি খোঁজখবর নিয়ে রিপোর্ট জমা দেবেন। সেইমতো পদক্ষেপ করা হবে। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট (সিসিএফ) শুভঙ্কর সেনগুপ্ত বলেন, এমন ঘটনার কথা আমার জানা নেই। যদি জঙ্গলের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটে থাকে, আমরা খতিয়ে দেখব। যদি অন্যায় কিছু হয়ে থাকে তবে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।