উত্তরের ফুলের গ্রাম এখন ফাঁসিদেওয়া

94

রণজিৎ ঘোষ, ফাঁসিদেওয়া : প্রথাগত চাষে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ে এবার ফুল চাষে ঝোঁক বাড়ছে ফাঁসিদেওয়ার চাষিদের। ব্লকের বিভিন্ন গ্রামে গাঁদা ফুলের চাষ ক্রমশ বাড়ছে। শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গে ফুলের  বাজার মূলত রানাঘাট সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার উপরে নির্ভরশীল। সেই জায়গায় উত্তরবঙ্গেই এবার গাঁদা চাষের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন ফাঁসিদেওয়ার চাষিরা। এক কথায় বলতে গেলে, ফাঁসিদেওয়া ব্লকে একাধিক ফুল গ্রাম তৈরি হচ্ছে। চাষিরা জানাচ্ছেন, ঠিকভাবে চাষ করলে বিঘা প্রতি বছরে লক্ষাধিক টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। যেখানে ধান সহ অন্যান্য ফসল চাষ করে লাভের অঙ্ক অনেকটাই কম, এমনকি প্রচুর ঝুঁকিও রয়েছে। ফাঁসিদেওয়ার ব্লক কৃষি আধিকারিক লোকনাথ শর্মা বলেন, গাঁদা ফুল চাষ করে চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। আমরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে কিছুটা আর্থিক সাহায্য করছি। চাষের এলাকা আরও বাড়ানোর বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

শিলিগুড়ি মহকুমার যে দুটি ব্লকে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়, তার মধ্যে অন্যতম ফাঁসিদেওয়া। ধান, পাটের পাশাপাশি রকমারি শাকসবজি চাষ করে সংসার চালান এই ব্লকের সিংহভাগ মানুষ। আগে জমিতে শুধুমাত্র আমন সহ অন্যান্য ধান, পাট চাষ হত। কিছুটা মাষকলাই ডাল, মুলো, টমেটোর চাষও হত। কিন্তু ধীরে ধীরে চাষের পরিধি বেড়েছে। এই ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকায় গত এক দশক ধরে ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, রাইশাক, ধনে, মটরশুঁটি, মিষ্টিকুমড়ো, লাউ সহ অন্যান্য সবজির চাষ হয়।

- Advertisement -

কিন্তু ধান চাষ করে চলতি বছর অসময়ে বৃষ্টিতে প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। পাশাপাশি তাঁরা সবজি চাষ করে ষাঁড়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। জমিতে বেগুন, টমেটো সহ অন্যান্য সবজি খেয়ে চলে যাচ্ছে ৩০-৪০টি ষাঁড়। দীর্ঘদিন ধরেই ষাঁড়ের অত্যাচারে নাস্তানাবুদ অবস্থা চাষিদের। এই পরিস্থিতিতে ফুল চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা। হলুদ গাঁদা, রক্ত গাঁদা সহ তিন ধরনের গাঁদা ফুলের চাষ করছেন এখানকার চাষিরা। আর হাতেনাতে তার সুফলও পেয়েছেন।

চাষিরা জানিয়েছেন, এক বিঘা জমিতে ৮,০০০ গাঁদা ফুলের চারা বসানো যায়। জমিতে চাষ করা থেকে অন্যান্য সমস্ত খরচ ধরলে ১২-১৪ হাজার টাকা খরচ রয়েছে। তিন মাস পরে ফুল বিক্রি হয় ন্যূনতম ৩০-৩৫ হাজার টাকা। আবার পুজো বা বিয়ের মরশুম থাকলে ৭০-৮০ হাজার টাকার ফুলও বিক্রি হচ্ছে।

জালাস, রাধাজোত, নির্মলজোত, কোদালিপাড়া, কামারগছ সহ জালাস নিজামতারা এবং ফাঁসিদেওয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা মিলিয়ে ব্লকে প্রায় ৩৫০ বিঘা জমিতে বর্তমানে গাঁদা ফুলের চাষ হচ্ছে। তবে, শুধু শীতকাল নয়, এখন সারাবছরই এখানে গাঁদা ফুল চাষ করছেন কৃষকরা। কখনও বাড়ি থেকেই ফড়েরা এসে ফুল নিয়ে যাচ্ছে, আবার কখনও চাষিরাই সরাসরি ফুল তুলে শিলিগুড়ির মহাবীরস্থান ফ্লাইওভারের নীচের ফুল বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন।

ফুলচাষি অসিত মজুমদার, তপন বসু, মহানন্দ মণ্ডল, পরিমল বিশ্বাসদের বক্তব্য, ধান, শাকসবজি চাষ করে আমরা ভালোই সংসার চালাচ্ছিলাম। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চাষের খরচ বৃদ্ধি সহ অন্যান্য সমস্যায় এসব প্রথাগত চাষে খরচ বাড়ছিল, লাভ কমছিল। তাই পরীক্ষামূলকভাবে এখানে কয়েবছর আগে গাঁদা ফুলের চাষ করা হয়। সেই চাষে ভালো সাফল্য মেলে। এখন পুরো ব্লকেই ফুল চাষ হচ্ছে।