হিন্দুত্ব বনাম বাঙালিয়ানা, বাংলায় বিজেপিকে রুখতে নয়া ছক তৃণমূলের

509

প্রিয়জিৎ দাস, কলকাতা : বিজেপিকে রুখতে লোকসভা ভোটের সময় থেকেই প্রচ্ছন্ন সুরে বাংলা ও বাঙালির আবেগকে হাতিয়ার করতে শুরু করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনা সেই আবেগের বারুদে অনেকটাই ঘৃতাহুতি করেছিল। তাতে বাংলায় বিজেপির বাড়বাড়ন্ত ঠেকানো না গেলেও গেরুয়া শিবিরের গায়ে বাঙালি বিরোধী এবং বহিরাগত তকমা সেঁটে দেওয়া অনেকটাই সহজ হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে। একুশের মহাযুদ্ধের আগে তাই বিজেপি-আরএসএসের আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের মোকাবিলায় বাঙালিয়ানার আবেগকেই অস্ত্র করছে রাজ্যের শাসক শিবির। বিজেপিকে বহিরাগতদের দল হিসেবে প্রচারের পাশাপাশি শিবসেনার মারাঠি অস্মিতা, ডিএমকের তামিল জাত্যভিমানের দেখাদেখি তৃণমূল কংগ্রেসও এবার নিজেদের বাঙালি জাতীয়তাবোধের ধারক এবং বাহক হিসেবে বাংলার মানুষের সামনে হাজির করতে চাইছে। রাজ্য সরকারের ৯ বছরের কাজের খতিয়ান তুলে ধরার পাশাপাশি বাঙালি আবেগের মন্ত্রে ভোটারদের মন জয়ের এই উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অবশ্য দ্বিমত রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। বিজেপি তো বটেই, কংগ্রেসও জোড়াফুল শিবিরের এই বাঙালি আবেগ নিয়ে রাজনীতি করার তীব্র বিরোধিতা করেছে। কিন্তু সেই সমস্ত সমালোচনাকে দূরে সরিয়ে আপাতত হিন্দুত্ব বনাম বাঙালিয়ানার লড়াইয়ে সলতে পাকাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে বাঙালিয়ানায় মন দিতে গিয়ে যাতে অবাঙালি ভোট হাতছাড়া না হয় সেজন্য হিন্দিভাষীদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার সমানভাবে আন্তরিক, সেকথাও জোরকদমে প্রচার করার কৌশল নিয়েছে শাসক শিবির।

দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় বলেন, আগামী বিধানসভা ভোটে উন্নয়নের প্রচারের পাশাপাশি বাঙালি জাতীয়তাবোধকেও আমরা সামনে রাখব। বাঙালি গৌরব শুধুমাত্র বাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই মাটির সমস্ত সন্তানের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। রাজ্যের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিজেপি যেভাবে বাইরে থেকে নেতাদের আমদানি করছে, তার মোকাবিলায় এই দর্শন অনেকটাই সাহায্য করবে। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, বাঙালি আঞ্চলিকতাবাদ গেরুয়া শিবিরের উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দুত্বের মোকাবিলায় অনেকটাই কার্যকর হবে। দলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, জেডিইউ প্রায়ই বিহারি বনাম বহিরাগত তত্ত্বের কথা বলে। মহারাষ্ট্রেও মারাঠি অস্মিতা শিবসেনার সব থেকে বড় হাতিয়ার। এমনকি বিজেপিও ২০০৭ সালে গুজরাটের ভোটে গুজরাটি অস্মিতার স্লোগান তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তৃণমূল তাই বাংলার সংস্কৃতি এবং পরিচয়ে রক্ষাকর্তা হিসেবে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চাইছে। দুয়ারে সরকারের মতো উন্নয়নের ফিরিস্তি শুনিয়ে কিংবা বাংলার গর্ব মমতা স্লোগান তুলে কেন বিজেপির মোকাবিলা করা যাচ্ছে না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় দলনেত্রীর আস্থাভাজন এক নেতা বলেন, বিভেদকামী এবং মেরুকরণের রাজনীতির মোকাবিলায় শুধু উন্নয়নের ফিরিস্তি কার্যকর নয়। সেক্ষেত্রে একমাত্র উপ-জাতীয়তাবাদ এবং আঞ্চলিকতাবাদই বড়রকমের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। বামেদের উৎখাত করতে মা-মাটি-মানুষের স্লোগানকে হাতিয়ার করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে দল। কিন্তু তার মধ্যে জমি আন্দোলনের ঝাঁঝ যতটা ছিল, বাঙালি আঞ্চলিকতাবাদ কিংবা বাঙালিয়ানায় মোড়া রাজনৈতিক আবেগ ছিটেফোঁটাও ছিল না। তৃণমূলের অন্দরের খবর, বিজেপির কট্টর হিন্দুত্বের মোকাবিলায় প্রথমে নরম হিন্দুত্বের পথে হেঁটেছিল দল। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। একদিকে জাতীয়তাবাদ অন্যদিকে, হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ভর করে রাজ্যে তড়তড়িয়ে বেড়েছে বিজেপি। বাঙালিয়ানার এই গন্ধ যে তৃণমূলের অন্দরেই শুধু লেগেছে তা নয়। বর্তমানে বিক্ষুব্ধের তালিকার শীর্ষ স্থানে থাকা রাজ্যের সদ্য প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ক্রমশ বাঙালি জাত্যভিমানের অঙ্কে লাভ-ক্ষতির হিসেব কষছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। সোমবার রাসের একটি অনুষ্ঠানে শুভেন্দুবাবুকে পুরোদস্তুর ধুতি-পাঞ্জাবিতে দেখা গিয়েছে। তাঁর বাবা তথা তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ শিশির অধিকারী ধুতি-পাঞ্জাবি পরলেও কাঁথির অধিকারী পরিবারের মেজো ছেলেকে সাধারণত পাজামা-পাঞ্জাবিতেই দেখতে অভ্যস্ত মেদিনীপুর এবং গোটা বাংলা। কিন্তু শুভেন্দুবাবুও যেভাবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে যোগ দিচ্ছেন, তাতে পরিষ্কার, বাংলা ও বাঙালির গৌরবকে হাতিয়ার করার কৌশল তৃণমূলের একচেটিয়া থাকছে না।  এই পরিস্থিতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে বহিরাগত এবং বাংলা ও বাঙালি বিরোধী দলের তকমা সেঁটে আগ্রাসী প্রচার চালিয়ে রাজ্যের সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যে ভালো সাড়া মিলেছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

- Advertisement -

বাঙালি জাত্যভিমানকে সামনে রেখে নির্বাচনি যুদ্ধে নামার যুক্তি হিসেবে দলের এক নেতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ৮৬ শতাংশ মানুষ বাঙালি। ব্রিটিশ জমানা থেকে বাঙালি স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি। স্বাধীনতার পর কংগ্রেস জমানাতেই হোক বা বামেদের শাসনেই হোক, বাঙালি কোনওদিনই দিল্লির অঙ্গুলিহেলনে চলেনি। চলবেও না। এরাজ্যে হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি কাজ করবে না। বস্তুত, ভূমিপুত্র বনাম বহিরাগত তর্কে ইন্ধন জুগিয়ে ইতিমধ্যে বিজেপিকে যথেষ্ট চাপে ফেলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সম্প্রতি রাজ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা এবং বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডার টিম বাংলায় দলের দায়িত্ব নিয়ে ঘাঁটি তৈরি করেছে। রাজ্যে গেরুয়া শিবিরে কর্মকাণ্ডের গোটাটাই নিয়ন্ত্রণ করছে ওই টিম। তার ওপর বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প মুখের অভাবও বিজেপির কাছে অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল যে বাঙালি আবেগের ঘুঁটি সাজাচ্ছে তার মোকাবিলায় গেরুয়া শিবিরকেও যে অতিরিক্ত ঘাম ঝরাতে হবে সেটাও স্পষ্ট। রবিবার মন কি বাতে কৃষকদের বিক্ষোভ প্রশমনের পাশাপাশি বিশিষ্ট বাঙালি মনীষী ঋষি অরবিন্দ এবং বাংলা কবিতা উদ্ধৃত করে বাঙালির আবেগের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা-ও কথায় কথায় রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের কথা বলে সোনার বাংলা গড়ার স্লোগান দেন। কিন্তু তাতে বাঙালির মননের হদিস বিজেপির পক্ষে কতটা পাওয়া সম্ভব, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছে খোদ গেরুয়া শিবিরই।

রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, রাজ্যের মানুষকে ঠিক করতে হবে তাঁরা কাদের বেছে নেবেন। বহিরাগত নাকি ভূমিপুত্রদের। এই সিদ্ধান্তের ওপর আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সোমবার আরও এক মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন বিজেপির ৯৯ শতাংশ নেতা-নেত্রীর সঙ্গে বাংলার কোনও আত্মিক যোগাযোগ নেই বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস বাঙালি-অবাঙালি ভেদাভেদ করে না। আমরা বাংলার মানুষের জন্য আগেও কাজ করেছি, আগামীদিনেও করব। ইন্দ্রনীলের খোঁচা, বিজেপির এক নেতা কিশোরকুমারের গান গেয়ে মান্না দে-কে সম্মান জানিয়েছিলেন। আবার কিশোরকুমারের জন্মদিনে মহম্মদ রফির গান গেয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ অবশ্য তৃণমূলের বাঙালি জাতীয়তাবোধ নিয়ে ভোটে নামার বিষয়টিকে পাত্তা দিতে চাননি। তিনি বলেন, আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলার একজন স্মরণীয় মনীষী ছিলেন। তাহলে আমাদের দল বহিরাগত হল কীভাবে। বাংলা কি ভারতের বাইরে। তৃণমূল পরাজয় নিশ্চিত বুঝে এখন এই ইস্যুগুলি তুলছে। দলের সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের তোপ, তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের স্বাগত জানাচ্ছে। অথচ অন্য রাজ্যের মানুষকে এরাজ্যে বহিরাগত বলা হচ্ছে। দেশের আর কোনও রাজ্যে এমনটা হয় না। শুধু বিজেপি নয়, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরীও তৃণমূলের এই বাঙালিয়ানার রাজনীতির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, তৃণমূল যেভাবে আঞ্চলিকতাবাদের আগুন নিয়ে খেলছে তা সাংঘাতিক। যদিও তৃণমূলের বাঙালিয়ানার রাজনীতিতে অন্যায়ের কিছু দেখছে না বাংলাপক্ষের মতো সংগঠনগুলি। ওই সংগঠনের নেতা কৌশিক মাইতি বলেন, বাঙালি গৌরবের বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের মানুষের উচিত সচেতন হওয়া। বাংলার সংস্কৃতির সব থেকে বড় বিপদ হল বিজেপি। তারা বাঙালিদের ওপর অবাঙালিদের আধিপত্যে বিশ্বাসী।

হিন্দিভাষীদের কাছে টানার চেষ্টা করলেও তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে বাঙালির আবেগকে হাতিয়ার করে বিজেপির রাজনৈতিক মোকাবিলায় নামছে, তাতে বাঙালি-অবাঙালি ভেদাভেদ আরও বাড়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক মহলের একাংশ অবশ্য মনে করে, তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে বাঙালির আবেগকে হাতিয়ার করে বিজেপির রাজনৈতিক মোকাবিলায় নামছে, তাতে বাঙালি-অবাঙালি ভেদাভেদ আরও বাড়বে। কলকাতা তো বটেই, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, আসানসোল, রানিগঞ্জের মতো এলাকাগুলিতে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ডের মতো হিন্দিবলয়ের মানুষজন কয়েক প্রজন্ম ধরে রয়েছেন। এই হিন্দিভাষী উত্তর ভারতীয়রা পশ্চিমবঙ্গের জলহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন অনেকদিন ধরে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বাড়বাড়ন্তের নেপথ্যে এই উত্তর ভারতীয়দের ভূমিকা সব থেকে বেশি বলে মনে করেন তথ্যভিজ্ঞ মহল। একদা তাঁদের মধ্যে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপক প্রভাব থাকলেও কালের নিয়মে তা ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। সেই জায়গাটা দখল করছে বিজেপি। তৃণমূল একদা তাঁদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও মোদি জমানায় গেরুয়া শিবির ক্রমশ আধিপত্য বিস্তার করছে বাংলায় বসবাসকারী হিন্দিভাষীদের মধ্যে। জায়গায় জায়গায় রামমন্দির, হনুমান মন্দিরের সংখ্যাও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বাংলার হিন্দিভাষী বলয়গুলিতে। বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির প্রভাব ওই হিন্দিভাষীদের কাছে টানতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল যে বাঙালি আবেগকে হাতিয়ার করছে, তাতে অবাঙালিদের ভোটব্যাংক পুরোপুরি বিজেপির দিকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তৃণমূল অবশ্য তাদের হিন্দি সেলকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছে। দলের প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ তথা হিন্দি সেলের সভাপতি বিবেক গুপ্তা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের হিন্দিভাষীদের জন্য অনেক কাজ করেছেন। তাঁদের জন্য আগামীদিনেও রাজ্য সরকার কাজ করবে। হিন্দি সেলের মাধ্যমে আমরা হিন্দিভাষীদের মন জয় করতে পারব।