সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি, ১ ২ এপ্রিলঃ ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও ধূপগুড়ি বিধানসভাটি আসন সে যাত্রায় অধরাই ছিল তৃণমূলের। তবে তার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ১৬টির মধ্যে ১১টি আসন জিতে ধূপগুড়ি পুরসভার দখল নেয় তারা। তারপর ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে জয়ী হয় তৃণমূল। সেই সঙ্গে ২০১৭ সালের পুরসভা ভোটেও আগের ১১টি আসনের সঙ্গে আরও একটি বাড়িয়ে ক্ষমতায় ফেরে তারা। তবে ২০১২ থেকে তৃণমূলের ভেতরেও দল ও যুব শাখার মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যায়।

গত পুর বোর্ডের আমলেই তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান অরূপ দে-র সঙ্গে কয়েকজন কাউন্সিলারের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। তৃণমূলের অন্দরের খবর, দলের ভেতরের সেই সমস্যার জেরেই ২০১৭ সালের পুর নির্বাচনে সবচাইতে বেশি ভোটে জিতেও ভাইস চেয়ারম্যানের পদ খোয়াতে হয় অরূপবাবুকে। আর জয়ী হওয়া সত্ত্বেও চেয়ারম্যানের পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় শৈলেনচন্দ্র রায়কে। এরপরেও দলের ভেতরে ঠান্ডা লড়াই থামেনি। তবে পদ থেকে অরূপ দে-র অপসারণের ফলে তাঁর চরম বিরোধী বলে পরিচিত টাউন ব্লক তৃণমূল যুব সভাপতি বিপ্লব ঘোষ এবং সহযোগীদের ক্ষমতা অনেকটাই বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে ধূপগুড়ি টাউন ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি করা হয় অরূপ দে-কে। ফলে বিবদমান তৃণমূল এবং দলের যুব শাখা, দুপক্ষই ফের শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফের শুরু হয় ঠান্ডা লড়াই যা বর্তমানে বড়ো আকার নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছে যে তৃণমূল ও তৃণমূল যুবর কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকছেন না অন্যপক্ষের নেতা, কর্মী এমনকি দলীয় কাউন্সিলাররাও।

বর্তমানে তৃণমূলের ১২ জন কাউন্সিলারের মধ্যে তৃণমূলের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকেন দুজন। আবার তৃণমূল যুবর ব্যানারে দেখা যায় বাকি দশজনকে। বুধবার বিকেলে তৃণমূল যুবর ব্যানারে দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে মহামিছিলের ডাক দেওয়া হয়। সেখানে তৃণমূলের টাউন ব্লক সভাপতি অরূপ দে এবং প্রাক্তন চেয়ারম্যান শৈলেনচন্দ্র রায উপস্থিত না থাকলেও দলের বর্তমান চেয়ারপার্সন ও ভাইস চেয়ারম্যান সহ ১০ কাউন্সিলার উপস্থিত ছিলেন। এই ছবিই কয়েকদিন আগে তৃণমূল যুবর কনভেনশনেও দেখা গিয়েছে। একইভাবে তৃণমূলের নির্বাচনি কর্মসূচিতে দেখা মিলছে না যুব শাখার ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলার ও নেতাদের।

নেতাদের এই ঠান্ডা লড়াই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে দলের অন্যান্য সংগঠনের ওপরেও। যুব ও মূল সংগঠনের লড়াইয়ের জেরে ইতিমধ্যেই পুরসভার কর্মী ইউনিয়নও দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। এখন আলাদাভাবে দুটি তৃণমূল সমর্থক ইউনিয়ন চলছে ধূপগুড়ি পুরসভায়। দলের ভেতরের এই লড়াইয়ের ছাপ পড়েছে ছাত্র সংগঠনেও। ২০০৯ সাল থেকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ব্লক সভাপতির দাযিত্ব সামলানো তৃণমূল যুব ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রাজু দত্তকে গত সপ্তাহে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে আহ্বায়ক করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের সৈকত সেন ও পার্থ সরকারকে। এর পেছনেও নেতাদের ঠান্ডা লড়াই কাজ করেছে বলে খবর। এদিকে, এই ঠান্ডা লড়াইয়ের ফলে ভোটের মুখে ধূপগুড়িতে দলের সাধারণ কর্মীরা দিশেহারা। টাউন ব্লক তৃণমূল সভাপতি অরূপ দে বলেন, সভাপতির দাযিত্ব নিয়ে এখনও অবধি ৪৯টি সভা ডেকেছি এবং ব্যক্তিগতভাবে সকলকে সেই সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তৃণমূল যুব সভাপতি বিপ্লব ঘোষ বলেন, দল কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

তবে নেতাদের এই ঠান্ডা লড়াইয়ে দলের কর্মীরা চূড়ান্ত বিরক্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুরোনো তৃণমূল কর্মী বলেন, গোটা পুর এলাকায় দলের সমস্ত কর্মী দুই শিবিরে ভাগ হয়ে রয়েছে। যার প্রভাব আগামী ভোটের ফলে পড়বেই। ২০১৭ সালের পুর নির্বাচনের হিসেব অনুযাযী ধূপগুড়ি পুর এলাকায় তৃণমূল মাত্র ২,২৩৯ ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপির চেয়ে বামেদের ভোট ছিল ২,৭০০-র কিছু বেশি। তৃণমূল কর্মীদের বড়ো অংশ মনে করেন, নেতাদের ঠান্ডা লড়াই রাস্তায চলে আসায় এবারের লোকসভা ভোটে ওই সামান্য ব্যবধান নাও থাকতে পারে।