বিশবাঁও জলে চোদ্দো কোটির ট্রাক টার্মিনাস প্রকল্প

476

রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : একবার বাম আমলে, আর একবার বছর তিনেক আগে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে ঘটা করে শিলান্যাস হয়েছিল ট্রাক টার্মিনাস প্রকল্পের। চোদ্দো কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করে মালদা জেলার একমাত্র ট্রাক টার্মিনাস নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিলেন ট্রাক মালিক, পরিবহণ কর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সকলেই। মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দিয়ে প্রমাণ মাপের পোস্টার লাগানো হয়েছিল। অথচ ঢক্কানিনাদই সার। দুবার উদ্বোধন, গালভরা প্রতিশ্রুতি সবই এখন ঢেকে গিয়েছে আগাছায়। পুরাতন মালদার নারায়ণপুর শিল্পতালুকে প্রস্তাবিত ট্রাক টার্মিনাস প্রকল্প আপাতত বিশ বাঁও জলে।

কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ-এই স্লোগান দিয়ে  বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাম সরকার রাজ্য জুড়ে শিল্পের প্রসারে উদ্যোগী হয়েছিল। মালদা জেলাতেও শিল্প বিস্তারে পুরাতন মালদার নারায়ণপুরে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক লাগোয়া এলাকায় শিল্পতালুক গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই মোতাবেক ওই এলাকায় সে সময় বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তৈরি হয় বড় বড় গোডাউন। বাণিজ্যিকভাবে ক্রমেই গুরুত্ব বাড়তে থাকে মালদার। পণ্য পরিবহণের জন্য তখন থেকেই জেলায় ট্রাক টার্মিনাসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। সেই প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখেই ২০০২ সালে নারায়ণপুর শিল্পতালুক ফেজ-১ এ প্রায় পাঁচ একর জমি একটি ট্রাক টার্মিনাস গড়ার উদ্দেশ্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সেটির শিলান্যাসও হয়েছিল। যদিও সেই প্রকল্প বাস্তবের মুখ দেখেনি।

- Advertisement -

এরপর রাজ্য জুড়ে পরিবর্তনের পর তৃণমূল ক্ষমতায় এলে ফের ওই ট্রাক টার্মিনাস তৈরির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। পুরাতন মালদা এলাকায় বহু শিল্প কারখানা ও গোডাউনের অবস্থানের কারণে ট্রাক টার্মিনাস তৈরির ব্যাপারে উদ্যোগী হয় উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর। প্রায় বছর তিনেক আগে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব ওই ট্রাক টার্মিনাস প্রকল্পটির ফের শিলান্যাস করেন। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪,২৯,৮৬,১০২ টাকা। প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর এমন একটি অত্যাধুনিক ট্রাক টার্মিনাস তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় তিন হাজার লরি রাখার ব্যবস্থা হবে বলে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের ওই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিল জেলার ব্যবসায়ী ও পরিবহণ মহল। মালদা জেলা পরিষদের মাধ্যমে ওই কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদিও বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আজও টার্মিনাসের কাজ এগোয়নি এতটুকু। টার্মিনাসের জন্য বরাদ্দকৃত জমি ক্রমেই জঙ্গলে মুখ ঢেকেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেওয়া পোস্টারটি কোনওরকমে দাঁড়িয়ে থাকলেও ট্রাক টার্মিনাস প্রকল্প আপাতত বিশ বাঁও জলে।

টার্মিনাস তৈরি না হওয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জেলার ব্যবসা ও পরিবহণ ক্ষেত্রে। মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের সম্পাদক জয়ন্ত কুণ্ডু বলেন,  মালদার মতো  বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ট্রাক টার্মিনাস না থাকাটা অত্যন্ত লজ্জার। বাণিজ্যিক কারণেই জেলায় ট্রাক টার্মিনাস জরুরি। নারায়ণপুর শিল্পতালুকে ট্রাক টার্মিনাস তৈরির যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তা দুবার শিলান্যাস হয়ে বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ পুরাতন মালদায় শিল্প কারখানার পাশাপাশি এফসিআই, সিমেন্ট, গ্যাস ও একাধিক গোডাউন রয়েছে। সেই সব গোডাউনের লরি ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে। যার ফলে পুরাতন মালদায় সারা বছর যানজট লেগে থাকে। টার্মিনাস থাকলে এই সমস্যা হত না। তাছাড়া পরিবহণের জন্য লরি ভাড়া পেতে দালালদের দৌরাত্ম্যও অনেকটাই কমত। আমরা বিষয়টি জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের নজরে আনব।

মালদা জেলা ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক উত্তম কুণ্ডু বলেন, মালদার মতো জেলায় ট্রাক টার্মিনাস অত্যন্ত জরুরি। টার্মিনাস না থাকায় বর্তমানে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আমাদের। এবিষয়ে মালদা জেলা পরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল জানান, নারায়ণপুরের ওই ট্রাক টার্মিনাসটি পিপিপি মডেলে তৈরি করা হবে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর থেকে এজন্য প্রয়োজনীয় টাকা এখনও আসেনি। তাই কাজ শুরু হতে দেরি হচ্ছে। টাকা হাতে পেলেই দ্রুততার সঙ্গে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।