ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে বামনগোলায় জমে উঠল টুসু মেলা

256

মালদা, ১৫ জানুয়ারি:  ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে বুধবার বামনগোলার ছাইতনতলা টাঙন নদীর ধারে জমে উঠল টুসু মেলা। পৌষ মাসের প্রথম দিন থেকে ছাইতনতলা এবং পাশ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে মূর্তি গড়ে শুরু হয় লোককথা আর বিশ্বাসের প্রতীক টুসু পুজো। একমাস ধরে পুজো শেষে পৌষ মাসের শেষ দিনে ছাইতনতলা  টাঙন নদীর ধারে গ্রামের সমস্ত টুসু মূর্তি একত্রিত করে টুসুপুজো ও পুজোকে কেন্দ্র করে চলে আসছে শতাব্দী প্রাচীন এই টূসুমেলা।
একশতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই মেলা টুসুমেলা নামেই পরিচিত। মূলত কুড়মি সম্প্রদায়ের মানুষজনের এই পুজো ও উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা হলেও সমস্ত ধর্ম,বর্ণের ভেদাভেদ ভেঙে প্রতি বছরই এই মেলা পরিণত হয় সম্প্রীতির মিলন মেলায়। টুসু পুজো ও টুসুকে কেন্দ্র করে উৎসব বা মেলার পেছনে রয়েছে জনশ্রুতি ও লোককথা।
জনশ্রুতি অনুযায়ী টুসু ছিলেন একজন সাধারণ পরিবারের সর্বগুনান্বীতা সুন্দরী রমনী। পরিভ্রমনে বেড়িয়ে টুসুকে দেখে তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন ভিন ধর্মের কোনো প্রভাবশালী রাজা। যে কোনো কারণেই টুসু এই বিয়েতে মত দেননি। টুসুর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর অভিভাবকরাও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রাজাকে। রাজা তাঁদের কিছুদিন ভাববার সময় দিয়েছিলেন। বিয়েতে রাজি না হলে জোর করে বিয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথাও জানিয়েছিলেন রাজা।  কিন্তু টুসুই বিয়েতে অমতের বিষয়ে অটল ছিলেন। কোনো ভাবেই রাজি ছিলেন না এই বিয়েতে। টুসু বুঝেছিলেন এবার নেমে আসবে রাজরোষ। তাঁর অমতে জোর করে বিয়ে হলে মর্যাদা ও সম্ভ্রম নষ্ট হবে তাঁর। টুসু নিজের মর্যাদা ও সম্ভ্রম রক্ষায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে হারিয়ে যান চিরদিনের জন্য। নারীত্বের সম্ভ্রম রক্ষা করতে টুসুর এই আত্মত্যাগ তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে মানবী থেকে দেবীতে উন্নীত করে।  তারপর থেকেই তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে দেবীরূপে পুজো পেয়ে আসছেন তিনি। কিন্তু সময় বদলেছে। সম্প্রদায়গত বা অন্য কোনো কারণে বিয়েতে অনিচ্ছার বিষয়টি হারিয়ে গিয়ে টুসু পুজো ও পুজোকে কেন্দ্র করে মিলন মেলা এখন সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষজনের মিলনে সম্প্রতির মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
টুসুর পুজো ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা বৈচিত্র। টুসু পুজোয় আগ্রহী গ্রামের মহিলারা নিজেরাই টুসুর মূর্তি গড়েন। কয়েকটি বাড়ি মিলে পাড়ায় পাড়ায় টুসুর পুজো শুরু হয় পৌষ মাসের প্রথম দিন থেকে। পুজোর ভোগ  হিসেবে থাকে চিড়ে, গুর, মুড়ি, বাতাসা,ছোলা ইত্যাদি। মূর্তির পাশে থাকে একটি  নতুন মাটির হাঁড়ি। প্রতিদিন টুসুর নামে একটি করে ফুল হাঁড়িতে রেখে সরা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। সঙ্গে করা হয় টুসুর গান। পৌষ মাসের শেষে অর্থাৎ সংক্রান্তি দিন এলাকার সমস্ত টুসুর মূর্তি  একত্রিত করা হয়  ছাইতনতলা  টাঙন নদীর ধারে। সেখানে আবারও একসাথে শেষ বারের মতো  টুসুর পুজো হয়। সঙ্গে হয় টুসুর গান। চলে টুসু গানের প্রতিযোগিতাও। গানে ফুটে ওঠে কল্পনা,দুঃখ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ সহ সামাজিক নানা অভিজ্ঞতার সুর। নানা লোকাচার শেষে এরপর সমস্ত টুসুর মূর্তি এবং একমাস ধরে টুসুর নামে রাখা ফুল ভরতি মাটির হাঁড়ি মহিলারা মাথায় করে টুসুর গান গাইতে গাইতে  বিসর্জন দেন টাঙন নদীর জলে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে  বিদায় জানান তাঁদের প্রিয় টুসুকে। আর মানবী থেকে দেবীতে উন্নীত হওয়া টুসুকে কেন্দ্র করে  ছাইতনতলা টাঙন নদীর ধারে এই মেলা হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির মিলন ক্ষেত্র।