অস্তিত্ব সংকটে দ্বাদশ শতকের শিবমন্দির

রাজু হালদার, গঙ্গারামপুর : উঁচু ইমারতের মাঝে ক্রমশ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে গঙ্গারামপুরের প্রাচীন শিবমন্দির। স্বল্প চর্চিত এবং স্বল্প পরিচিত টেরাকোটার এই সুদৃশ্য শিবমন্দিরটি সম্প্রতি স্থানীয়দের উদ্যোগে সংস্কার করা হলেও আজও এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি উপেক্ষিত। জেলা পর্যটন মানচিত্রে ব্রাত্য প্রায়। শহর তথা জেলাবাসীর কাছে স্বল্প পরিচিত এই প্রাচীন মন্দিরটিকে পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত করার দাবি তুললেন বিশিষ্টজনেরা।

গঙ্গারামপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের গঙ্গারামপুর হাইস্কুলপাড়ায় স্থানীয় একটি পুকুরের ধারে প্রাচীন টেরাকোটার মন্দিরটি অবস্থিত। বড়ো বিদ্যালয় ভবন এবং স্থানীয় বড়ো বড়ো বাড়ির মাঝে মন্দিরটি প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছে। প্রাচীন এই টেরাকোটার মন্দিরটি দ্বাদশ শতকে নির্মাণ করা হয় বলে গবেষকদের ধারণা। অর্থাৎ এই প্রাচীন শিবমন্দিরটি বাণগড় সভ্যতার সমসাময়িক সময়ে তৈরি করা হয়েছে বলে অনুমান। ৩০ ফুট উচ্চতার এবং ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট এই মন্দিরের ওপরের অংশটি গম্বুজাকৃতি এবং নীচের অংশটি বর্গাকার। মন্দিরের ৪টি কোণ বীটমুক্ত এবং ৩টি খাঁজে বিভক্ত। মন্দিরের দরজার ঠিক ওপরের ফলকে রাজাদের যুদ্ধের ছবি, রাম ও হনুমানের ছবি, রাবণের তির চালনার ছবি এবং নন্দী-ভৃঙ্গী সহ ষাঁড়ের পিঠে শিবের ছবি রয়েছে। মন্দিরের অন্দরের শিবলিঙ্গটি জৈন শিল্পরীতি অনুয়ায়ী তৈরি করা হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। প্রাচীন এই টেরাকোটার মন্দিরের ইতিহাস প্রসঙ্গে শিক্ষক তথা ইতিহাস গবেষক অরিন্দম সরকার বলেন, প্রাচীন এই শিবমন্দির নির্মাণ এবং নির্মাতা সম্পর্কে তেমন কোনো শিলালেখ নেই। কেউ কেউ এই প্রাচীন মন্দিরটিকে বাণগড়ের সমসাময়িক মনে করেন। তবে দিনাজপুরের জমিদারের কোনো এক নায়েব এটি নির্মাণ করেন বলে বিশেষ সূত্রে জানা যায়। সেই হিসাবে এর বয়স আনুমানিক ৩০০ বছরের কাছাকাছি।

- Advertisement -

মন্দিরের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে অরিন্দমবাবু বলেন, প্রাচীন টেরাকোটার এই মন্দিরটি এখনও অপূর্ণ সৌন্দর্যতার প্রতীক হিসাবে বর্তমানে রয়েছে। এই মন্দিরের গায়ে অনেক টেরাকোটার নকশাদার ব্লক ছিল এক সময়। বর্তমানে মন্দিরে প্রবেশদ্বার একমাত্র দরজার ঠিক উপরে পৌরাণিক যুদ্ধের দৃশ্য বর্তমান। পৌরাণিক বহু চরিত্রের ছবি আজও অমলিন। মন্দিরের কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গটির গঠনশৈলীও বেশ আধুনিক। মূলত জৈন শিল্প রীতির। শিবলিঙ্গের সবচেয়ে নীচের বৃত্তাকার বেদিটি ব্রহ্মপিঠ। তার ওপরের অংশটি বিষ্ণুপিঠ এবং শীর্ষের অংশটি শিবপিঠ। বর্তমান সময়ে এই মন্দিরটির গুরুত্ব অপরিসীম। সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দারা টেরাকোটার এই প্রাচীন শিবমন্দিরটি সংস্কার করেন। মন্দিরের নীচের অংশ সাদা এবং ওপরের অংশ গেরুয়া রং করা হয়। প্রতি বছর শিবরাত্রিতে এই মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে এবং মেলা বসে।

এ প্রসঙ্গে ইতিহাস গবেষক তথা ডিস্ট্রিক্ট হেরিটেজ সোসাইটির সম্পাদক ডঃ সমিত ঘোষ বলেন, গঙ্গারামপুরের শিবমন্দিরটি অত্যন্ত প্রাচীন। এই মন্দিরটিকে উপযুক্ত সংরক্ষণের ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগী হওয়া উচিত। এই সমস্ত প্রাচীন নিদর্শনকে প্রচারের আলোয় তুলে আনতে হবে। এই প্রাচীন নিদর্শনগুলি সঠিকভাবে না বাঁচালে গঙ্গারামপুরকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের যে পর্যটন ভাবনা রয়েছে তা নষ্ট হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি সমিতবাবু বলেন, ইতিমধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলা উত্তর দিনাজপুর বেশ কিছু প্রাচীন স্থান হেরিটেজ তকমা পেয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সম্পূর্ণ অবহেলিত রয়েছে। দ্রুত এসব প্রাচীন স্থান যাতে হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়, তারজন্য সরকারের কাছে আমরা আবেদন জানাচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে গঙ্গারামপুর শহরবাসী তথা বিশিষ্ট সাহিত্যিক জয়ন্ত আচার্য বলেন, গঙ্গারামপুর শহরের প্রাচীন শিবমন্দিরটি বাণরাজের টাকশালের ম্যানেজারকে দিয়ে বানানো হয়েছিল বলে জনশ্রুতি। গঙ্গারামপুর শহরের মধ্যে অপূর্ব সুন্দর এই মন্দিরটি প্রায় প্রচারের আলো থেকে দূরে রয়েছে। এই মন্দিরে প্রতি বছর শিবরাত্রির সময় পুজো হয়। প্রাচীন এই মন্দিরটি যাতে দ্রুত সংরক্ষণ করে জেলার পর্যটন মানচিত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয় তার দাবি জানাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা দেবলীনা আচার্য বলেন, এই শিবমন্দিরটি আমাদের পূর্বপুরুষরা এভাবেই দেখে আসছেন। এটি বাণরাজার আমলের মন্দির বলে জেনে আসছি। মন্দিরের গঠনশৈলী আগের মতোই রয়েছে। তবে কিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি মন্দিরের কিছু অংশ সংস্কার করে রং করা হয়েছে। তবে মন্দিরের কোনো কারুকার্যের পরিবর্তন করা হয়নি।