হকি কিংবদন্তি কেশব দত্ত প্রয়াত

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা : ভারতীয় ক্রীড়া জগতে ইন্দ্রপতন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে জীবনাবসান হল দেশের প্রবীণতম সোনজয়ী অলিম্পিয়ান কেশব দত্তের। ৯৫ বছর বয়সে দক্ষিণ কলকাতার বাসভবনে এই হকি কিংবদন্তির মৃতু্য় হয়েছে।

ভারতীয় হকির স্বর্ণযুগের সদস্য ছিলেন কেশব দত্ত। ১৯২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের লাহোরে তাঁর জন্ম হয়। লাহোরের সরকারি কলেজে পড়াশোনা শেষে মুম্বই আসেন। ছোট থেকেই ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিক্স সহ বিভিন্ন খেলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু বিশ্বজোড়া খ্যাতি এসেছিল হকির হাত ধরেই। খেলতেন সেন্টার হাফব্যাক হিসেবে। হকির দুই কিংবদন্তি কেডি সিং বাবু এবং ধ্যানচাঁদের তত্বাবধানে খেলা শেখেন। ১৯৪৮ সালে অলিম্পিকে ভারতীয় দলের সোনা জয়ের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এরপর ১৯৫২ অলিম্পিকের সোনা পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। সহ অধিনায়ক হিসেবে সব ম্যাচে মাঠে নামেন। তবে দলে ডাক পেয়েও পেশাগত কারণে ১৯৫৬ গেমসে অংশ নিতে যেতে পারেননি কেশব। না হলে সোনা জয়ের হ্যাটট্রিক হয়ে যেত তাঁর। ১৯৪৭ সালে ধ্যানচাঁদের নেতৃত্বে দেশের হয়ে পূর্ব আফ্রিকা সফরেও গিয়েছেন কেশব।

- Advertisement -

কেশব পঞ্জাব, বোম্বে ও বাংলার হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছেন। ১৯৫০ সালে ব্রডওয়ে হোটেলের মালিক ইকবাল সিংয়ের ডাকে ১৯৫০ সালে ক্যালকাটা পোর্ট কমিশনার্সের হয়ে খেলতে আসেন। তারপর আর কলকাতা ছেড়ে যাননি। পোর্টের হয়ে খেলার সময় মোহনবাগানের তৎকালীন হকি সচিব তথা অভিনেতা জহর গঙ্গোপাধ্যায়ের নজরে আসেন তিনি। তাঁর অনুরোধেই কেশব মোহনবাগানে যোগ দেন। দুদফায় তিন মরশুম (১৯৫১-৫৩ সাল এবং ১৯৫৭-৫৮ সাল) মোহনবাগানের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৫২ সালে তাঁর অধিনায়কত্বেই প্রথমবার বেটন কাপ জেতে তারা। সেবছর ক্যালকাটা হকি লিগও আসে গঙ্গাপাড়ের ক্লাব তাবুতে। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মোহনবাগানের হয়ে খেলেছেন কেশব। এই এক দশকে মোহনবাগান তিনবার বেটন কাপ এবং ছয়বার ক্যালকাটা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়।

জাতীয়স্তরে সম্মান পাওয়ার ক্ষেত্রে সবসময়ই উপেক্ষা পেয়েছেন কেশব। দুটি অলিম্পিক মিলিয়ে মাত্র ৪ গোল খাওয়া ভারতীয় দলের এই সদস্য অর্জুন বা ধ্যানচাঁদ পুরস্কার পাননি, জোটেনি পদ্ম-সম্মানও। তবে ২০১৩ সালে রাজ্য সরকারের তরফে তাঁকে বাংলার গৌরব সম্মান দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে মোহনবাগান রত্ন সম্মান পান তিনি। ফুটবলের বাইরের ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনিই প্রথম এই সম্মান পেয়েছেন। গতবছর রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যান দপ্তর এবং হকি বেঙ্গলের তরফে পৃথকভাবে জীবনকৃতি সম্মানও দেওয়া হয় তাঁকে।

তার মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে টুইট, হকি বিশ্ব একজন প্রকৃত কিংবদন্তিকে হারাল। কেশব দত্তের প্রয়াণে আমি মর্মাহত। তিনি ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ অলিম্পিকে সোনজয়ী দলের সদস্য। বাংলা ও ভারতের চ্যাম্পিয়ন। তাঁর পরিজনদের সান্ত্বনা জানাই। শোকজ্ঞাপনের পাশাপাশি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। অন্যদিকে, হকি বেঙ্গলের তরফে শোক প্রকাশ করেছেন সচিব ইস্তিয়াক আলি। হকি ইন্ডিয়ার সভাপতি জ্ঞানেন্দ্র নিনগোমবামও শোক প্রকাশ করেছেন।

বর্তমানে কলকাতায় একাই থাকতেন এই হকি কিংবদন্তি। তাঁর মেয়ে ডেনমার্কে থাকেন। বাবার মৃত্যুর খবর পেলেও আন্তর্জাতিক উড়ানে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকায় এখনও দেশে ফিরতে পারেননি। হকি বেঙ্গলের সভাপতি স্বপন (বাবুন) বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ১১ জুলাই সকালে কেশব দত্তের মেয়ে কলকাতায় পৌঁছাবেন। আপাতত এই হকি কিংবদন্তির দেহ শহরের একটি পিস হেভেনে রাখা থাকবে। মেয়ে ফিরলে তাঁর শেষকৃত্য হবে।