তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে শরিক হয়তো টুইটার-ফেসবুক

148

কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায় 

গণ্ডগোলটা বিশ্বের নজরে আসে জানুয়ারিতে। ওভাল অফিসে তখনও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদ্যমান। যদিও আমেরিকানরা ভোটে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না। বাইডেন শপথ না নেওয়ায় ট্রাম্প কাজ চালাচ্ছিলেন।এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে কয়েক হাজার ট্রাম্প-সমর্থক হামলা চালাল ক্যাপিটল হিলে। আর টুইটারে ট্রাম্প কার্যত সিলমোহর বসালেন এই গুন্ডামির। ট্রাম্পকে টুইটার আজীবনের জন্য ব্যান করল সেদিন। রাষ্ট্রের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার যুদ্ধের ভেরি কিন্তু বেজে গেল।

- Advertisement -

যাঁরা ভেবেছিলেন, ট্রাম্পের উপর এই নিষেধাজ্ঞা আদতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, টুইটার আসলে আমজনতার হয়ে বিপথগামী রাজনীতিবিদদের সবক শেখাচ্ছে, তাঁদের ভ্রান্তিও অচিরেই দূর হল। পটোম্যাকের অশান্ত ঢেউ আছড়ে পড়ল দেশ থেকে দেশান্তরে। কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি হয়ে দিল্লিতেও। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ- মূলত এই তিন অতিকায় মার্কিন বহুজাতিকের সঙ্গে নানা বিষয়ে ব্রিটেন থেকে কেনিয়ার বিবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। দিন কয়েক আগে আফ্রিকাতেও টুইটার প্রবল বিতর্কে পড়ে। নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে নাইজিরিয়ার প্রেসিডেন্ট মহম্মদ বুহারির টুইটার অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা হয়। দুদিন আগে ট্রাম্পকে দুবছর সাসপেন্ড করল ফেসবুক।

আর এই বিতর্কের মাঝে শনিবার যা ভারতে হল, তাও বেশ বিতর্কিত। শাসকদলের সঙ্গে টুইটারের বিবাদ চলার মাঝেই উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডুর টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে নীল টিকচিহ্ন উড়ে যায়। উপরাষ্ট্রপতির সঙ্গে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের নীল টিকচিহ্ন চলে গেল। মানে তাঁদের সরকারি অ্যাকাউন্টের যথার্থতা নিয়ে টুইটার নিশ্চিত নয়। বিস্তর চ্যাঁচামেচির করার কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্য নীল টিকচিহ্ন ফিরে আসে। টুইটার বলে, কেউ টানা ছমাস অ্যাকাউন্টে লগ ইন না করলেই এমন হয়। এ ঘটনা ফের বোঝাল, সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থার সঙ্গে ভারত সরকারের দূরত্ব বেড়েই চলেছে। একেই হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে কেন্দ্রের মামলা চলছে।

প্রশ্ন হল, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে পৃথিবীজুড়ে রাষ্ট্রশক্তির এই সংঘাত কেন?

প্রথমেই দেখা যাক, সংঘাতের ক্ষেত্রগুলো কী কী? ফেসবুকের ক্ষেত্রে যেমন তার কয়েকশো কোটি গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে গড়ে ওঠা অতিকায় তথ্যভাণ্ডারের বাণিজ্যিকীকরণের লাভের গুড় চাইছে রাষ্ট্র, তেমনই ঘুরপথে হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে জনগণের মত প্রকাশের সীমারেখা টানতে উদ্যোগী ক্ষমতাশালীরা। গ্রাহক-তথ্য নিয়ে ব্যবসায়ী সংস্থাগুলো এটা মানতে রাজি নয়।

কেন রাজি নয়? সংস্থার কর্তাদের যুক্তি, বিশ্বে এই প্রথম কয়েকশো কোটি মানুষ নির্ভয়ে নিজস্ব মত প্রকাশ করতে পারছেন তাঁদের প্ল্যাটফর্মে। যা আসলে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পক্ষে সহায়ক। কিন্তু বিশ্বের রাষ্ট্রশক্তি এই যুক্তি মানতে রাজি নয়। তাঁদের মতে, পৃথিবীজুড়ে যখন সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন ভুবনজোড়া এই মাধ্যমকে হিংসা ছড়াতে ব্যবহার করতেই পারে। তাই তাঁদের খুঁজে বের করতে নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকা জরুরি। অন্য পক্ষের যুক্তি, এই দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র আদতে তার বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের খুঁজবে। স্বাধীন বক্তব্য দেওয়ার পাট লাটে উঠবে।

ফেসবুকের সঙ্গে বিবাদ মূলত তার বিপুল গ্রাহক তথ্যভাণ্ডার বাণিজ্যিকীকরণের লভ্যাংশ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের দাবি, তাদের খবর ফেসবুকে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে এর প্রাপ্ত বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের অংশ তাদেরও পাওয়া উচিত। অস্ট্রেলিয়াতে এই নিয়ে জলঘোলার পর ফেসবুক কয়েকটি সংবাদ সংস্থার সঙ্গে চুক্তিও করেছে। ভারত সহ অন্য দেশেও এর রেশ পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামীতে এমন সংস্থার সঙ্গেই বিশ্বের রাষ্ট্রশক্তির অঘোষিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও বাঁধার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এইসব ছোটখাটো ঝামেলা সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ আর্থিক দিক দিয়ে সংস্থাগুলি বহু দেশের থেকে যেমন বিত্তশালী, তেমনই কয়েকশো কোটি জনমত এরা নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট। ফলে ক্ষমতার রাশ কার হাতে, সেটাই মূল বিচার্য হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ যেন ক্রমে কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক অ্যাসিমভের মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের বিবাদের মতো পরিস্থিতির দিকেই চলেছে।

(লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক)