মৃতদেহ নিয়ে টানাপোড়নে দুই বাংলা, উদ্বেগে পরিবার

464

রায়গঞ্জ: নাতনির বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদান করতে বাংলাদেশ থেকে এপারের রায়গঞ্জে মেয়ের বাড়িতে এসে হঠাৎ এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয় রবিবার ভোরে। কিন্তু মৃতদেহ বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার রানীনগরের এনায়েতপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছনো ঘিরে সীমান্তের আইনি জটে দেহের শেষকৃত্য নিয়ে কার্যত চরম বিপাকে মৃতার পরিবার পরিজন। ভারত বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সীমান্তের কর্তৃপক্ষের তীব্র চাপানউতোরের জেরে মৃতদেহ এপার থেকে ওপারের বাড়িতে পৌঁছনোর প্রক্রিয়া থমকে পড়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে, রবিবার সকালে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ থানার উদয়পুর এলাকার। মৃতা নিয়তি বালা (৬০)। বাংলাদেশের নওদা জেলার রানীনগর এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা।

এদিন দুপুরে সরকারি আইন মেনে রায়গঞ্জ মেডিক্যাল হাসপাতালের মর্গে দেহ ময়নাতদন্ত করা হয়। ওই মেডিক্যাল হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, ওই মহিলা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়। কিন্তু তারপরও দেহ বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া নিয়ে অনুমতি ঘিরে প্রবল সমস্যার মুখে পরিবার।

- Advertisement -

পরিবার সূত্রে জানা যায়, লকডাউনের আগে গত ১২ মার্চ ওই মহিলা বাংলাদেশ থেকে রায়গঞ্জে ১৩ নং কমলাবাড়ী গ্রাম পঞ্চায়েতের উদয়পুর গ্রামে মেয়ের বাড়িতে আসেন। তারপর লকডাউন শুরু হওয়ায় পূর্বঘোষিত নির্ধারিত তারিখে বিয়ের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। দীর্ঘ লকডাউনে বাংলাদেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আনলক পর্বের মধ্যে ২৪ আশ্বিন বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। তারপর দুর্গাপুজো শুরু হয়। লক্ষ্মীপুজোর পর বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার প্রস্তুতির মুখে এদিন মৃত্যু হয় ওই বাংলাদেশি মহিলার।

এদিন মৃতার মেয়ে শ্যামলী সরকারের বলেন, ‘মায়ের হঠাৎ ভোরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তারপর হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত বলে ঘোষণা করেন। তারপর সরকারি নিয়ম মেনে ময়নাতদন্ত করা হয়। কিন্তু এখন হিলি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের বাড়িতে দেহ নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি। উল্টে হিলি সীমান্ত রক্ষীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, কিছুদিন আগে ভারতের এক ব্যক্তি বাংলাদেশে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আচমকা মৃত্যু হয়। কিন্তু সেই দেহ ভারতে আনার কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে এখন হিলি সীমান্তের কম্যাডান্ট তরফে আমাদের বেলায় অনুমতি দিতে রাজি হচ্ছে না।’

এখানেই শেষ নয় রায়গঞ্জ শহরের পশ্চিম বীরনগরের বাসিন্দা অরুণ সরকার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল বাংলাদেশের জয়পুরহাট জেলার থানাপাড়া এলাকায়। সেই মৃতদেহ ভারতে নিয়ে আসতে দেয়নি বিজিবি। ফলে বাংলাদেশি কোন মৃতদেহ হিলি সীমান্ত দিয়ে যাবে না বলে বিএসএফ সূত্রে জানানো হয়।

মৃত বাংলাদেশি বৃদ্ধার নাতি বাপি সরকার বলেন, ‘রায়গঞ্জ থানার পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। শিলিগুড়ির ফুলবাড়ি দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া যায় কিনা সেই ব্যাপারে চেষ্টা করা হচ্ছে।’

মৃত বৃদ্ধার ছেলে কালিপদ বালা বলেন, ‘জয়পুরহাট হয়ে পাঁচবিবি পর্যন্ত এসে ফোন মারফত জানতে পারি মায়ের মৃতদেহ হিলি সীমান্ত দিয়ে আসবে না। তাই আমরা দিনাজপুর ঠাকুরগাঁ হয়ে ফুলবাড়ী সীমান্তে রওনা দিয়েছি। জানি না মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারব কিনা।’

অন্যদিকে, জেলার কর্ণজোড়ার ফরেনার রেজিষ্ট্রেশন অফিস তরফে ‘নো অবজেকশন’ সার্টিফিকেট মিললেও হিলি আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে দেহ ওপারে নিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্র হাতে পায়নি বলে মৃতার পরিবারের অভিযোগ।

তবে এদিন বিকালে রায়গঞ্জ পুলিশ সুপার সুমিত কুমার অবশ্য বলেন, ‘ওই মহিলার মৃতদেহ বাংলাদেশের বাড়িতে পৌঁছনোর জন্য ফুলবাড়ি বর্ডারের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। নির্বিঘ্নে ওপারে পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

এদিন বিকেল সাড়ে চারটার নাগাদ ওই বাংলাদেশি বৃদ্ধের মৃতদেহ কফিনবন্দি করে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। পরিবার নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেলেই মৃতদেহ নিয়ে ফুলবাড়ী সীমান্ত দিয়ে মৃতার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।