কলকাতায় ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছেন কৃষক পরিবারের দুই সন্তান

2519

ফালাকাটা: লক্ষ্যে অবিচল থাকলে কোনও বাধাই যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তা প্রমাণিত হল ফালাকাটায়। ময়রাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার কৃষক পরিবারের দুই কৃতী সন্তান এবারের নিট পরীক্ষায় ভাল র‍্যাংক করে ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছেন। তাঁদের একজনের নাম সুমন গোপ, আরেকজন হলেন শুভ্রজ্যোতি বর্মন। প্রথমজন ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছেন কলকাতার ডায়মন্ড হারবার সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। আর শুভ্রজ্যোতি ভর্তি হচ্ছেন ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে। দু’জনের বাবাই কৃষক। সন্তানদের এই সাফল্যে খুশির আবহের মধ্যেও যেন দারিদ্রতার কারণে কিছুটা চিন্তার মেঘ ঘনিয়েছে দুই কৃষক পরিবারে। তবে এই ময়রাডাঙ্গা থেকে সুমন ও শুভ্রজ্যোতিই প্রথম ডাক্তার হচ্ছেন। তাই এই খবরে ময়রাডাঙ্গার পাশাপাশি গোটা ফালাকাটার মানুষ উচ্ছ্বসিত। ফালাকাটা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুরেশ লালা বলেন, ‘দুই কৃতী পড়ুয়ার জন্য আমরা গর্বিত। দু’জনেরই আরও সাফল্য কামনা করি।’

ফালাকাটা-মাদারিহাট রাজ্য সড়কের পাশেই ময়রাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা। শহরের পাশে হলেও এই এলাকা মূলত কৃষি প্রধান। সুমন গোপের বাড়ি ময়রাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরের পাশেই। সে পুরোপুরি কৃষক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা আনন্দ গোপ সারা বছর জমিতে কৃষিকাজ করেন। সুমন পাঁচমাইল গোপ্পু মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশের পর ফালাকাটা হাই স্কুল থেকে ২০১৮ সালে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। তারপর তিনি রাজস্থানের কোটায় গিয়ে কোচিং নেন। আর এবছর নিট পরীক্ষায় পাশ করেন। সর্বভারতীয় স্তরে তাঁর র‍্যাংক ৩৩৫৭৬। এ রাজ্যে প্রথম কাউন্সেলিংয়ে সুমন ডাক্তারি পড়ার জন্য কলকাতার ডায়মন্ড হারবার সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। দ্বিতীয় কাউন্সেলিংয়ে আরও ভাল কোনও কলেজও তিনি সুযোগ পেতে পারেন।

- Advertisement -

অন্যদিকে একই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার পাঁচ মাইলে বাড়ি শুভ্রজ্যোতি বর্মনের। তাঁর বাবা শুধাংশু বর্মনও পেশায় কৃষক। তবে কৃষিকাজের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবেও শুধাংশু ভাবে এলাকায় পরিচিত। পাঁচ মাইল বাজারে তাঁর হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান রয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শুভ্রজ্যোতির পড়াশোনা হয়েছে নবোদয় বিদ্যালয়ে। তিনি মাধ্যমিক পর্যন্ত বারবিশা নবোদয় বিদ্যালয়ে পড়েছেন। তারপর পুনেতে জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের পাশাপাশি সেখানকার দক্ষনা ফাইন্ডেশনের সহযোগিতায় নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। তিনি চলতি বছরেই উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন এবং নিট পরীক্ষাতেও সাফল্য পান। সর্বভারতীয় স্তরে জেনারেল ক্যাটাগরিতে তাঁর নিট পরীক্ষার র‍্যাংক হয়েছে ৭৫৩৪৩, এসসি হিসেবে সর্বভারতীয় র‍্যাংক হয়েছে ২৭৯৯। শুভ্রজ্যোতি প্রথম কাউন্সেলিংয়ে ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

শুভ্রজ্যোতি বলেন, ‘বাবা, মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতে যাচ্ছি। তবে আমার এই সাফল্যের পিছনে নবোদয় বিদ্যালয় ও দক্ষনা ফাউন্ডেশনের অবদান সব থেকে বেশি। ভবিষ্যতে উত্তরবঙ্গে ভাল চিকিৎসা পরিষেবা দিতে চাই।’ তবে ছেলেকে নিয়ে খুশির মধ্যেই কিছুটা চিন্তিত বাবা শুধাংশু বর্মন। শুধাংশু বাবু বলেন, ‘পাঁচ বছর ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে অনেক খরচ হবে। জানি না কীভাবে সবকিছু করতে পারব। সরকারি সহযোগিতা পেলে ভাল হয়।’ সুমনের বাবা আনন্দ গোপের পরিস্থিতিও অনেকটা একই। আনন্দ বাবু বলেন, ‘আমাদের বংশে ছেলেই প্রথম ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছে। যত কষ্টই হোক না কেন, ওকে পড়াব। কিন্তু তবু নিজের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে একটু চিন্তিত। সাহায্য পেলে ভাল হয়।’ সুমন গোপ বলেন, ‘তিনবারের চেষ্টায় সফল হয়েছি। অনেক কষ্টে রাজস্থানের কোটায় থেকে কোচিং নিয়েছি। ভবিষ্যতে সার্জেন হয়ে গ্রামের মানুষকে বিনামূল্যে পরিষেবা দিতে চাই।’ এদিকে দুই কৃতী পড়ুয়াকে সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে সংবর্ধনা জানিয়েছে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের(এবিভিপি) ফালাকাটা নগর ইউনিট কমিটি। সংগঠনের নেতারা সবরকমভাবে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।