ভোট পরবর্তী দুমাসে সব পার্টিকে ঘিরেই প্রশ্নের পাহাড় বাংলায়

464

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

এক-একটা করে ঢেউ টিভির পর্দায়, খবরের কাগজের পাতায় জোয়ার আনে ইদানীং। পাঁচদিন চলে বড়জোর। ষষ্ঠীতেই হারিয়ে যায়। শোভন-বৈশাখী-রত্না। নুসরত-যশ-নিখিল। কাঞ্চন-পিঙ্কি-শ্রীময়ী। এবং দেবাঞ্জন।আসল কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এমন চর্চার মাঝে চাপা পড়ে যায়। কেউ তোলে না। শোভনের এত টাকার সম্পত্তি হল কী করে? নুসরতের প্রাক্তন প্রেমিক পার্ক স্ট্রিটে সুজেট কাণ্ডের পর সেই যে দেশ ছেড়ে পালাল, তাকে আর পুলিশ খুঁজে পেল না কেন? কাঞ্চনের স্ত্রীর সঙ্গে ঝামেলা নির্বাচনের পরেই প্রকাশ্যে কেন, পুলিশই বা দুজনের অভিযোগ নিয়ে কী করল এতদিন? মিমি চক্রবর্তীর মতো সাংসদ হঠাৎ সবাইকে ছেড়ে দেবাঞ্জনের ক্যাম্পে ভ্যাকসিন নিতে গেলেন কেন? এত কেনর উত্তর হয় না। বিশেষ করে যেসব প্রশ্নে জড়িয়ে যান রাজনীতিকরা। সব পার্টি এখানে এক হয়ে যায় রাতারাতি। চাপা পড়ে যায় যত রাজ্যের আসল প্রশ্ন।

- Advertisement -

শিলিগুড়িতে কেন যে এতদিন হংকং মার্কেটে তোলাবাজি চলে, মহানন্দার চর দখল হয়ে যায়, নদীগুলো উধাও হয়ে যায়, তার যেমন কোনও উত্তর নেই। এখানে তখন হঠাৎ এক গৌতম দেব-অশোক ভট্টাচার্য-শংকর মালাকার-শংকর ঘোষ। কলকাতায় কেন যে ধর্মতলার মোড় থেকে নিউ মার্কেট, পঙ্গপালের মতো হকারে ছেয়ে যায় কর্পোরেশনের সামনে, তারও উত্তর নেই। নিউ মার্কেট মৃত্যুমুখে। এই বিতর্কে সমান স্তব্ধ ববি হাকিম-বিকাশ ভট্টাচার্য-মীনা দেবী পুরোহিত। কেউ কোনও প্রতিবাদ না করে জড়ভরত হয়ে থাকেন কেন? এমন অন্তহীন কেন ঘুরে বেড়াতেই থাকে বাংলার এ শহর থেকে ও  শহরে। পালটে যায় শুধু প্রশ্নগুলো।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক দুমাস হয়ে গেল, শুরু হল বিধানসভার অধিবেশন। বাংলায় অনেক কেনর উত্তর এতদিনে মিলে যাওয়া উচিত। কিন্তু মিলছে না।

ভোটারদের উৎফুল্ল করার মতো কিছু প্রকল্প মুখ্যমন্ত্রী ইদানীং ঘোষণা করেছেন। গত দুমাসে দুয়ারে র‌্যাশন এবং স্টুডেন্টস ক্রেডিট কার্ড মমতার মাস্টার স্ট্রোক হলে সবচেয়ে সমালোচনার কাজ সিবিআই অফিসে ধৃত নেতাদের ছাড়াতে যাওয়া, বিরোধীদের থেকে পিএসি চেয়ারম্যানের পদ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। ইন্দিরা গান্ধিও কিন্তু তাঁর প্রবল অপছন্দের জ্যোতির্ময় বসুকে তিনবছর ওই পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। লোকসভায় বিজেপি পর্যন্ত সাত বছরে এই পদ ছেড়েছে কংগ্রেসের কেভি টমাস, মল্লিকার্জুন খাড়গে ও অধীর চৌধুরীকে। এটাই চিরকালীন রীতি। গণতান্ত্রিক রীতি। বাংলা ঘরের মেয়ে সঙ্গে গণতন্ত্রকেই চেয়েছিল না?

তৃণমূল নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর ফারাক ঘুচে গেলেই মুশকিল। নবান্ন থেকে মমতা মাঝে মাঝে প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যপালকে তোপ দাগছেন। বিজেপির স্ট্র‌্যাটেজি অনেকটা ফুটবলে ডিফেন্ডারদের মতো- বিপক্ষের সেরা ফরোয়ার্ডকে মাথা গরম করিয়ে লাল কার্ড দেখিয়ে দাও। ভোটের আগে খেলা হবে স্লোগান দিতেন মমতা। মঞ্চ থেকে বলও ছুড়ে দিতেন সমর্থকদের দিকে। তাঁর তো ফুটবলের এই ট্যাকটিক্স ভালো জানা উচিত।

মমতা একদিকে মুকুলকে ফিরিয়ে বলেছেন, অনেক বাছবিচার করে তৃণমূলে ফেরানো হবে আয়া-গয়াদের। ওদিকে বীরভম থেকে কোচবিহার দিদির ভাইরা দলে দলে পার্টিতে ফেরাচ্ছেন গণহারে। গণ মস্তকমুণ্ডন করিয়ে গণ স্যানিটাইজেশন করিয়ে মানে আবার সেই আদি বনাম নব ঝামেলা অন্য রূপে আবির্ভূত হবে।

রাজ্যের বিরোধী নেতা কী করছেন? সম্প্রতি তাঁদের কর্মীরা তৃণমূলের হিংসার শিকার বলে সরব বিজেপি নেতারা। শুভেন্দু অধিকারীর উচিত ছিল কোচবিহারে সমর্থকদের পাশে দাঁড়ানো। তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন নয়াদিল্লি। অমিত শার সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক চলছে।

শিশির অধিকারীর মেজো ছেলে আচমকা কী কারণে কপালে লালটিপ লাগিয়ে রাজ্যের একনম্বর হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেলেন, সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সারা রাজ্যে জনপ্রিয় নন। তবু শুভেন্দুর মাঝে মোদি বা শা অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে খুঁজে পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। যেমন মনে হচ্ছে রাজ্যপাল ধনকর একজন বিজেপি নেতা ছাড়া কিছু নন। দার্জিলিং রাজভবনে যেভাবে তিনি বঙ্গভাগের দাবি তোলা নেতাদের ডেকে ডেকে কথা চালালেন, তাতে দিলীপ ঘোষদেরও লজ্জা পাওয়ার কথা। শুভেন্দুরা যা করেননি, তা দেখিয়েছেন ধনকর। কোচবিহার থেকে অসম চলে গিয়েছেন বিজেপির ঘরছাড়া সমর্থকদের পাশে দাঁড়াতে।

এই দুটো মাসে বাংলায় আরও বড় আবিষ্কার অবশ্য অন্য- বিজেপিও আর পাঁচটা রাজনৈতিক পার্টির মতো। কোনও ফারাক নেই। এক বছর আগেও বিজেপি সম্পর্কে শোনা যেত, আরএসএসের শৃঙ্খলার জন্যই এই পার্টিতে বাঁধুনি অন্যরকম। নেতারা যা খুশি কিছু বলতে পারেন না। অন্য দলের দুর্নীতিগ্রস্তদের নেয় না। গত দুমাসে বাংলা পুরো ভারতকে দেখাল, ও সব বাজে তত্ত্ব। ক্ষমতার মোহে বিজেপি আরও একটা কংগ্রেস হয়ে গিয়েছে। যেখানে অমরিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নভজ্যোৎ সিধু চলে যাচ্ছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধির কাছে। ছবি পোস্ট করে বোঝান, দ্যাখো, কার সঙ্গে ছবি তুলছি! শুভেন্দু যেমন অমিতের সঙ্গে ছবি পোস্ট করে নীরব উল্লাস দেখান।

আরও উদাহরণ চান? বিজেপির গোখরো মিঠুন চক্রবর্তী ভরা বর্ষায় কোথায় শীতঘুমে গেলেন, কারও জানা নেই। রাজ্য সভাপতি জানেনই না, বিরোধী নেতা তাঁর সভায় না থেকে চলে যান নয়াদিল্লি। সভাপতির পাশাপাশি পালটা গোষ্ঠী তৈরি করেন বিরোধী নেতা। সভাপতি বলে  বেড়ান, পার্টি বাংলা ভাগ চায় না। ওদিকে সাংসদ জন বারলা বা বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায়েরা একই দিনে বলেন, উত্তরবঙ্গে আলাদা রাজ্য চাই। গো অ্যাজ ইউ লাইক খেলার মতো টেল অ্যাজ ইউ লাইক খেলা। আসলে যা দ্বিচারিতা। প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথাগত রায়ের প্রকাশ্যে নেতাদের বিদ্রুপে চুবিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে যাচ্ছিই না। দিলীপ সম্পর্কে তথাগতের কুৎসিত ব্যঙ্গ অনুব্রত মণ্ডলদের মতো নেতারাও করেননি।

মমতায় ফেরা যাক ফের। কিছু মন্ত্রীর পদ পালটে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না। ভালো। বঙ্গ মুঠোয় এলেও কিছু ভাইদের দাদাগিরিতে উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলা মমতার দিকে তাকায়নি। তারপরেও টলিউডে যেভাবে এখনও স্বরূপ বিশ্বাসের দাদাগিরি চলে, তাতে বড় অবাক লাগে। একই প্রশ্ন খেলার মাঠে মুখ্যমন্ত্রীর ভাই স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতিসক্রিয়তা নিয়ে তাঁর হাতে কী করে বাংলার সর্বোচ্চ ক্রীড়া সংস্থা বেঙ্গল অলিম্পিক সংস্থার ভার?

টলিউডে অনেককে বলতে শুনলাম, রাজ চক্রবর্তীকে আনা হয়েছে স্বরূপ-রাজ গুরুত্বহীন করতেই। খেলার মাঠে অবশ্য স্বপনের দাপট কমার লক্ষণ নেই। স্বপনে, স্বরূপে জোড়া ফুলের জোড়া কাঁটারই প্রকাশ। পদ্মের কাঁটা যেমন অধিকারী পরিবারের সাম্রাজ্য।

অবাক লাগে, এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলার উপযুক্ত নেতা কোনও বিরোধী দলেই নেই। ভোটের আগে খেলা ও সিনেমা নিয়ে এত উৎসাহ দেখানো বিজেপিতে হিরণ্ময় নীরবতা। এখানেও ছবিটা শিলিগুড়ির মতো। হঠাৎ নেতাদের প্রতিবাদ হাওয়া। রাজ্যের বাকি দুটো বিরোধী দল সিপিএম-কংগ্রেস এখনও ঘুমন্ত। রেড ভলান্টিয়ার্সদের দৌলতে সিপিএম নেতারা কিছু প্রচার পেয়েছেন কাজ না করেই। তা ছাড়া সিপিএম আছে শুধু টিভিতে সুজন চক্রবর্তীর বিবৃতি ও একদিনের পুরসভা অভিযানে। এবং হ্যাঁ, বিকাশ ভট্টাচার্যেও। যখন বিকাশ রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেন, তখন সিপিএম প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে দ্বিচারিতায়। কংগ্রেস? বাংলার কংগ্রেস গত দুমাসেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় অধীর বালক হয়ে দাঁড়িয়ে সিপিএমকে এখনও সুধীন কুমারের আর সিপিআই পার্টির মতো দেখাচ্ছে, তাদের জুটি কংগ্রেসকে সুশীল ধাড়ার বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেসের মতো।

দুমাস মানে অনেক সময়। ৬০ দিন। ১৪৪০ ঘণ্টা। ৮৬, ৪০০ মিনিট। এর মধ্যে কতটা হল নতুন বাংলার সামগ্রিক উন্নয়ন? এই প্রশ্নের উত্তরও আপাতত নেই।