দিল্লি থেকে রিকশা চালিয়ে বাবা-মার কাছে ফিরলেন দুই ছেলে

রাজশ্রী প্রসাদ তনয় মিশ্র, পুরাতন মালদা মোথাবাড়ি : এটাই নাড়ির টান। কারও মায়ের অপারেশন হয়েছে লকডাউনের মধ্যে। আবার কারও বাবা বাড়িতে অসুস্থ। এদিকে দুই ছেলের কর্মক্ষেত্র মালদা থেকে হাজার দেড়েক কিলোমিটার দূরে। দিল্লিতে রিকশা চালান দুজনেই। কিন্তু বাবা-মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে দুজনের কেউ আর চুপ করে বসে থাকতে পারেন। রিকশার প্যাডেলে চাপ দিয়ে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে দুই ছেলে চলে এসেছেন ঘরে। একজনের বাড়ি পুরাতন মালদার সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ছোট কাদিরপুরে, অন্যজনের বাড়ি পঞ্চানন্দপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ডেলফোরা গ্রামে। দীর্ঘ পরিশ্রমে ঘরে ফিরলেও করোনা সতর্কতা মানতে ভোলেননি কেউই। দুজনই স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছেন কোয়ারান্টিনে। বাবা-মায়ের ভাবনা এক করে দিয়েছে বিষ্ণু-সুজনকে। দুজনের কাহিনি এখন মুখে মুখে।

ছোট কাদিরপুরের বাসিন্দা বিষ্ণু মণ্ডল। বাপ-ঠাকুরদার বসতভিটে ছিল গঙ্গাতীরের পঞ্চানন্দপুরে। চার দশক আগে গঙ্গায় তলিয়ে যায় ভিটেমাটি। উদ্বাস্তু হয়ে পুরাতন মালদার ছোট কাদিরপুরে আশ্রয় নেন বিষ্ণুরা। একচিলতে জায়গায় কোনওরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেন সেখানে। পরিবারে রয়েছেন তাঁর বিধবা মা মিনতি মণ্ডল, স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান। অভাবের সংসারে হাল ধরতে দিল্লিতে কাজের খোঁজে চলে যান বিষ্ণু। সেখানে রিকশা টেনে যেটুকু আয় হত তা দিয়ে চলত সংসার। করোনা আবহে লকডাউন শুরু হওয়ায় প্রবল আতান্তরে পড়েন তিনি। করোনার প্রাথমিক ধাক্কা লেগেছিল মহারাষ্ট্র ও দিল্লির মতো জায়গাগুলিতেই। স্বভাবতই কাজ হারাতে হয় তাঁকে। তবে লকডাউন চলায় বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না তাঁর। এরই মধ্যে মায়ের শারীরিক অসুস্থতার খবর পৌঁছোয় তাঁর কাছে। ষাটোর্ধ্ব মিনতিদেবী চোখের জটিল রোগে ভুগতে থাকায় অপারেশন জরুরি হয়ে পড়ে। গ্রামের নিকটাত্মীয়দের সহযোগিতায় অপারেশনও হয়ে যায় মিনতিদেবীর। অসুস্থতার মধ্যে বারবার ছেলেকে দেখতে চাইছিলেন তিনি। মায়ের এমন করুণ অবস্থার কথা শুনে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেননি বিষ্ণু।

- Advertisement -

কোনও উপায় না থাকায় যে মালিকের কাছে রিকশা ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁকে অনুরোধ জানান তিনি। মালিক রাজি হওয়ায় রিকশা চালিয়ে মালদায় বাড়ির উদ্দেশ্যে তিনি রওনা দেন। ২৮ এপ্রিল রাতে দিল্লি থেকে রিকশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তবে এই যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় নাকা চেকিং থাকায় জাতীয় সড়ক ধরে আসার সুযোগ ছিল না তাঁর। বহু জায়গায় পুলিশ আটকায় তাঁকে। তবে মায়ের অসুস্থতার কথা জানতে পেরে মানবিকতা দেখিয়ে অনেকেই আর তাঁর পথ আটকাননি। ১৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ দীর্ঘ ১৩ দিন ধরে রিকশা চালিয়ে পার করেন তিনি। অবশেষে সোমবার দুপুর দুটো নাগাদ গ্রামে এসে পৌঁছোন বিষ্ণু। ছেলের আসার খবর শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন মিনতিদেবীও। যদিও লকডাউনের বিধি মেনে বাড়িতে না ঢুকে তিনি সোজা মৌলপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চলে যান। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাঁকে ১৪ দিনের হোম কোয়ারান্টিনের নির্দেশ দেন চিকিৎসাকরা। সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন তিনি।

বিষ্ণু বলেন, আমার অভাবের সংসার। মা ও স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার আশায় দিল্লি গিয়েছিলাম রিকশা চালাতে। তবে লকডাউন শুরু হয়ে যাওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহন না চলায় ঘরে ফিরতে পারছিলাম না। কিন্তু যখন শুনলাম মা অসুস্থ, আমাকে দেখতে চাইছেন, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। যে মালিকের রিকশা চালাতাম সেই রিকশা নিয়ে ২৮ এপ্রিল দিল্লি থেকে রওনা দিই। আজ বাড়ি ফিরে মাকে দেখলাম। মনে একটু শান্তি পেলাম। ভিনরাজ্যে আটকে না থেকে নিজের পরিবারের সঙ্গে কষ্ট করে থাকলেও অনেক শান্তি। এদিকে ছেলেকে ঘরে ফিরতে দেখে আনন্দে চোখের জল ফেলছেন মা মিনতি মণ্ডল। তিনি বলেন, ছেলে আমাকে খুব ভালোবাসে। অসুস্থ হওয়ায় ছেলেকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছিল। ফোনে সেকথা বলতেই ও যে রিকশা নিয়ে রওনা দেবে ভাবতেও পারিনি। এখন ছেলেকে ঘরে ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। মায়ের প্রতি বিষ্ণুর এমন ভালোবাসা দেখে গ্রামের মানুষরাও কুর্ণিশ জানিয়েছেন তাঁকে। কৃষ্ণ মণ্ডল নামে তাঁর এক আত্মীয় বলেন, এই যুগেও মায়ের জন্য ছেলের এমন টান সচরাচর লক্ষ করা যায় না। বিষ্ণু যেটা করেছে সেটা মা আর ছেলের নাড়ির টানকে আরও একবার প্রমাণ করে দিয়েছে। সাংসারিক অনটন কাঁটার মত খচখচ করলেও, মা ও ছেলের এই মিলন তার থেকে অনেক বেশি সুখের, শান্তির।

এদিকে, এদিনই দিল্লি থেকে একইভাবে ১৫ দিন ধরে রিকশা চালিয়ে ঘরে ফিরে এসেছেন কালিয়াচক-২ ব্লকের পঞ্চানন্দপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ডেলফোরা গ্রামের সুজন মণ্ডল। বয়স মাত্র ২০। বাড়িতে বাবা চৈতন্য মণ্ডল ও মা অসুস্থ। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে একমাত্র ভাই। বাবার চিকিৎসা ও সংসারের প্রয়োজনে তিনি তিন মাস আগে দিল্লিতে যান। সেখানে রিকশা চালাতেন তিনিও। কিন্তু হঠাৎ লকডাউনে চরম সমস্যায় পড়ে যান তিনি। এদিকে বাবার শরীরের অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে থাকায় উপায়ান্তর না দেখে রিকশা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন সুজন। তিনি বলেন, ২৭ এপ্রিল রিকশা নিয়ে মালদার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, গয়া, বিহার, ঝাড়খণ্ড, পাকুড় হয়ে ফরাক্কা দিয়ে মালদায় ঢুকি। এই পথ পেরোতে ১৫ দিন সময় লেগেছে। আমরা ১৪ জন ছিলাম। সবাই মালদার। এভাবেই প্রত্যেকে ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু পথে সবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তবে জানি, বাকিরা সবাই পাকুড় চলে এসেছে। খুব তাড়াতাড়ি প্রত্যেকেই জেলায় ঢুকে পড়বে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার রিকশা চালাতাম। প্রতিটি রাজ্যের চেকপোস্টে পুলিশ আমাদের আটকেছে। সবার শারীরিক পরীক্ষা করেছে। বাবার অসুস্থতার কথা শুনে সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক জায়গায় পুলিশ খাবার এবং ওষুধ পর্যন্ত দেয়। আসলে আমি বাড়ির একমাত্র ছেলে। বাড়িতে বাবা অসুস্থ। তাই আর দিল্লিতে বসে থাকতে পারিনি। রিকশা নিয়ে ঘরে চলে এসেছি।

পুরাতন মালদার বিষ্ণুর মতো সুজনও জেলায় এসে প্রথমে বাড়ি না গিয়ে চলে যান বাঙ্গীটোলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা। তাঁরা সুজনকে ১৪ দিনের জন্য হোম কোয়ারান্টিনে থাকার নির্দেশ দিলে তিনি সোজা বাড়িতে গিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েন। সুজনের এই মানসিকতার প্রশংসা করেছেন ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক কৌশিক মিস্ত্রি। তিনি বলেন, অনেকেই গোপনে গ্রামে ফিরে বাড়িতে চলে যাচ্ছে। প্রত্যেক পরিযায়ী শ্রমিকের উচিত, বাড়ি ঢোকার আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা। এক্ষেত্রে সুজন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। তবু তাঁকে হোম কোয়ারান্টিনে থাকতে বলা হয়েছে।