বিনা পয়সায় পড়িয়ে চোখের মণি দুই বোন

162

বিপ্লব হালদার, তপন : বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় দশা। তবে তাতে দমানো যায়নি দুই বোন, সুচিত্রা ও সুমিত্রাকে। অনটনকে তুচ্ছ করে বিনা পারিশ্রমিকে আদিবাসী শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে চলেছেন এই দুই কলেজ পড়ুয়া। তপনের আদিবাসী অধ্যুষিত চণ্ডীপুর পঞ্চায়েতের কাজিভাগ গ্রামের এই কন্যা এখন আদিবাসীদের চোখের মণি।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন ব্লকের বেশিরভাগ গ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত। তেমনই একটি আদিবাসী গ্রাম হল চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজিভাগ। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ শ্রমিকের কাজে যুক্ত। বর্তমানে করোনা আবহে শ্রমিকদের কাজ কমে গিয়েছে। অনেকে আবার ভিনরাজ্য থেকে বাড়িতে ফিরে কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে বাড়িতে বসে রয়েছেন। তাই একদিকে যেমন পেট চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে, অপরদিকে ইচ্ছে থাকলেও ছেলেমেয়েদের গৃহশিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করাতে পারছেন না। স্কুলও প্রায় এক বছর বন্ধ থাকায় পড়ুয়ারা লেখাপড়া থেকে অনেকটা দূরে সরে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী ঘরের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্বভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন কাজিভাগ গ্রামের কলেজ ছাত্রী দুই বোন সুচিত্রা ও সুমিত্রা বর্মন। সুচিত্রা এবছর বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। দিদি সুমিত্রা সবে বিএ পাশ করেছেন। তাঁদের পরিবারে রয়েছেন মা ও বাবা। সংসারের আর্থিক অবস্থা ভালো না। বাবা রান্নার কাজ করেন। তবে করোনার জেরে অনুষ্ঠান বাড়ি কমে যাওয়ায় রোজগার নেই বললেই চলে। সংসারে তাই নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা। কিন্তু গ্রামের কচিকাঁচারা যাতে লেখাপড়া থেকে দূরে সরে না যায়, সেদিকে নজর দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতে শুরু করেছেন তাঁরা। ছোট বোন সুচিত্রা প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়ান। সেই সঙ্গে ছোটদের অ,আ,ক,খ শোখায়। বড় বোন সুমিত্রা পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রদের পড়ান। আর এতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন আদিবাসী পরিবারের লোকজন।

- Advertisement -

কাজিভাগ গ্রামের গৃহবধূ বুলটি বারো বলেন, শ্রমিকের কাজ করে আমাদের সংসার কোনওরকমে চলে। তাও আবার লকডাউনের পর থেকে সেভাবে কাজ নেই। এই অবস্থায় টাকার অভাবে ছেলেমেয়েদের গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে পারছিলাম না। স্কুল বন্ধ থাকায় এবং গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে দিতে না পারায় লেখাধুলো করেই ছেলেমেয়েদের দিন কাটছিল। এই অবস্থায় আমার এক ছেলে এক মেয়েকে বিনা পয়সায় লেখাপড়া করাচ্ছে গ্রামের মেয়ে সুচিত্রা ও সুমিত্রা। এতে আমরা ভীষণ খুশি। আমার ছেলেমেয়ে সুচিত্রা ও সুমিত্রার কাছ থেকে ভালোই লেখাপড়া শিখেছে। গৃহবধূ টুম্পা টপ্পো বলেন, করোনার জন্য স্কুল বন্ধ। সেজন্য আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। তাছাড়া ছেলেমেয়েদের গৃহশিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করানোর মত আমাদের টাকা নেই। কারণ, শ্রমিকের কাজ করে আমাদর সংসার চলে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে ও গৃহশিক্ষকের কাছ যেতে না পারায় বাড়ির কাজে মন দিয়েছিল। কিন্তু আমাদের গ্রামের মেয়ে সুচিত্রা ও সুমিত্রা বিনা টাকায় বাড়িতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছে। এতে ছেলেমেয়েরা আগ্রহের সঙ্গে লেখাপড়া ভালো করে শিখতে পারছে।

সুচিত্রা বর্মন বলেন, আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের। এমনিতেই অনেকে লেখাপড়ার করার সুযোগ পান না।  তারপর করোনার জন্য প্রায় এক বছর হল স্কুল, কলেজ বন্ধ। সেজন্য গ্রামের ছেলেমেযো স্কুলে যেতে না পেরে খেলাধুলোয় মেতে থাকছে। লেখাপড়া ভুলে যাচ্ছে। অর্থের অভাবে অনেকেই তাঁদের বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াতে পারছেন না। গ্রামের শিশুরা যাতে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা দুই বোন বিনা পারিশ্রমিকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছি। যতদিন পারব আমরা গ্রামের পড়ুয়াদের এই ভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে যাব।